মুক্তকথাশৈশব, শিক্ষা ও শাস্তি

সময় সংবাদ

fb tw
somoy
শৈশব, শিক্ষা আর শাস্তি--শব্দ তিনটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ভিন্ন হলেও প্রায়োগিক দিক থেকে কিন্তু এরা ওতপ্রোতভাবেই  জড়িত। শৈশবের শিক্ষায় শাস্তির ভারসাম্য একটি সীমাহীন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেকটা খাবারে লবণের মতো-বেশি অথবা কম কোনোটিই আপনার ক্ষুৎপিপাসা মেটাবে না, আর নিদেনপক্ষে মেটালেও আনবে না পরিতৃপ্তি।
বর্তমান সময়ে আত্মহত্যা সব বয়সে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত, প্রেমে ব্যর্থতা, পারিবারিক অশান্তি, বেকারত্ব কিংবা আর্থিক অস্বচ্ছলতা, সামাজিক প্রত্যাশা চাপের নেপথ্যের মূল কারণ।
তবে আত্মহত্যার পেছনে যে কারণটি সব থেকে বেশি অবহেলিত থেকেছে সবসময় সেটি বোধ করি আমাদের নৈতিক অবক্ষয়। আর বলা বাহুল্য, নৈতিক শিক্ষা শুরু যে শৈশব থেকে, অবক্ষয়ের শুরুও কিন্তু সেই সেখান থেকেই। মিল্টন বলেছেন- ‘The childhood shows the man, as morning shows the day’ অর্থাৎ,  বাল্যকালেই পরিণত মানুষের পরিচয় মেলে। শিশুর (১৮ বছরের কম) নৈতিক আচরণ শিক্ষা আর পারিবারিক সুষম সম্পর্ক বজায় রেখে সহজেই শিশুর চারিত্রিক গুণাবলির বিকাশ ঘটানো যায়। আমরা বাবা মা সন্তানের ওপর জন্মদান।
সূত্রে এক ধরণের ঐশ্বরিক ক্ষমতা/কর্তৃত্ব বা Absolute power উপলব্ধি করি।  আর Baron Acton এর সেই কথার মতো-‘Power Tends to corrupt, absolute power corrupts absolutely.’ ; আমরা বাবা মা হিসেবে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা প্রায়শই ভুলে যাই। আমরা মনে করি, সন্তানের জন্য বাবা মা অপেক্ষা ভালো আর কেউ চান না। সন্তানের জীবনে বাবা মায়ের ভূমিকার অবমূল্যায়ন করা আমার উদ্দেশ্য নয়, বরং বাবা মার নিছক অসচেতন আচরণ কিভাবে একটি বাচ্চাকে নৈতিক অবক্ষয় ও অবিচার অনুশাসনের দিকে ঠেলে দেয় তার একটি বাস্তব উদাহরণ দিচ্ছি।
মোবাইল ফোন বা স্মার্টট্যাব এখনকার বাচ্চাদের হাতে একটি অতি পরিচিত ও জনপ্রিয় গ্যাজেট- যা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নয় বরং বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেই শোভা পাচ্ছে তাদের হাতে। বাচ্চাকে খাওয়াতে কিংবা বিরক্ত কম করবে- শুধু এই কথা চিন্তা করে সাময়িক প্রশান্তির জন্য আমরা দুএক বছরের শিশুর হাতে তুলে দিচ্ছি স্মার্ট ফোন নামক মরণনেশা, আর সেই বাচ্চাটিই যখন প্রাইমারির গণ্ডি না পেরোতেই নিজের একটি স্মার্টফোনের জন্য বায়না ধরে, তখন আমরা তাকে সেটি কিনে দিতে বাধ্য হই অথবা না দিয়ে নৈতিকতার মানদণ্ড স্থাপন করি।
অথচ প্রখ্যাত দার্শনিক Bertrand Russell বলেছেন- ‘একটি বাচ্চার ভেতর যে স্বতঃস্ফূর্ত মালিকানা স্বত্বের জন্ম নেয় তা থেকে তাকে বঞ্চিত করা অনৈতিক এবং স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী কাজ।’ 
কিন্তু যে বস্তুটিতে আমরাই তাকে আসক্ত করিয়েছিলাম আমাদের সুবিধার্থে, সেইখান থেকে আবার আমরাই তাকে বিরত থাকতে বলে নৈতিকতার শিক্ষা দিচ্ছি! ব্যাপারটা কেমন হিপোক্রিটিসিজম হয়ে গেলো না! আমরা বাবা মা  হিসেবে বাচ্চাদের সময় তো দিচ্ছিই না, বরং তাদের ন্যায্য সময়টুকু থেকেও নিজেদের দায়মুক্ত রাখার চেষ্টা করছি মাত্র।
আমি স্মার্টফোন অথবা ইন্টারনেটের আশীর্বাদ কে অস্বীকার করছি না। কিন্তু ভেবে দেখুন তো, বাচ্চারা সেই ইতিবাচক দিক কতটুকু গ্রহণ করছে? ফেসবুক, এডাল্ট সাইট, ব্লু হোয়েল, অথবা সেমিপর্ণ মিউজিক ভিডিও দেখিয়ে আমরা বাচ্চাদের সস্তা বিনোদনের ব্যবস্থা করছি। যেখানে বই, শিক্ষামূলক ভিডিও,আউডোর স্পোর্টিং, ইন্ডোর ফ্যামিলি গেমস, পাজেল/লেগো, আর্ট,মিউজিক ইত্যাদি হতে পারতো শিশুর নৈতিক বিকাশের হাতিয়ার, সেখানে বাচ্চা বয়সে 'ম্যাজিক মামুনি' গান শুনিয়ে বাচ্চার মুখে ভাত তুলে দিয়ে কৈশোর পেরোতে না পেরোতেই আমরা তাকে শালীনতা শিখতে বলি! আমাদের এই দ্বিমুখী আচরণ আমাদের বাচ্চাদের জন্য কতটা শুভ?
এখানে আরেকটি বিষয়ের অবতারণা না করে পারছি না। নিজের জীবন নিজে শেষ করা যায় এই কুশিক্ষাটি আমাদের বাচ্চারা কোথা থেকে পাচ্ছে? উত্তর হতে পারে, হয় পরিবার থেকে বাচ্চাদের সামনে আমাদের অসচেতন কথাবার্তায়, অথবা সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব ইত্যাদি মাধ্যমে। ফেসবুক আসার পর শৈশব কৈশোরে বিষন্নতা, আত্মহত্যার মতো ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে একথা আমরা সকলে জানি। ফানি কন্টেন্ট ক্রিয়েশানের নামে আমাদের দেশের তথাকথিত ইউটিউব কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা যে ভালগারিটি প্রদর্শন করছে তার দায়ভার কি? সমাজের অংশ হিসেবে আমরা এড়িয়ে যেতে পারি?
বয়স্ক লোকেরা বাচ্চাদের যতটা অবুঝ মনে করেন, বাচ্চারা তার থেকে অনেক বেশি ধূর্ত। যদি তারা দেখে কান্না করলেই স্বস্তিদায়ক কিছু মেলে তবে তারা কাঁদবে। এইভাবে কখনো কখনো কোনো বাচ্চা আত্মহত্যাকে দাবি আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শিখে যায়। আমরা হরহামেশাই এখন ছোট ছোট বাচ্চাদের মুখে শুনি- ‘এটা না দিলে আমি মরে যাবো! ওটা না পেলে আমি আত্মহত্যা করবো!’ এবং অনেক সময় আমরা বাবা মা হিসেবে তাদের এই হুমকিতে অনেক অনৈতিক দাবিই পূরণ করে তাদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেই। আর এভাবেইএকটি বাচ্চার কাছে তার জীবনের মূল্য ক্রমশ অবনমিত হতে থাকে অবচেতনভাবেই। অপরিমিত আদর ও সীমাহীন শাসন দুটোই একটি শিশুর নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ।
শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি অভিমানী হয় এবং তাদের আবেগের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কম থাকে। এ অবস্থায় তাকে আদর অথবা শাসনের যৌক্তিকতা ও পরিমিতিবোধ বাবা মা ও শিক্ষকদের থাকাটা বাঞ্ছনীয়। শিক্ষার কথা আসলে স্বভাবতই যাদের কথা আসবে তাঁরা হচ্ছেন আমাদের শিক্ষক। বাবা মার পরেই একটি শিশুর মেধা মনন গঠনে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তার শিক্ষক- কখনো কখনো তা বাবা মাকেও ছাড়িয়ে যায়। ‘বাবা মায় বানায় ভূত, গুরুতে বানায় পুত! এমন অনেক আঞ্চলিক উপকথা এখনো আমাদের সমাজে প্রচলিত।
শিক্ষকের মর্যাদা নিয়ে উচ্চমার্গীয় রচনাসমগ্র আমরা শিক্ষার্থীদের গলধঃকরণ করালেও একজন শিক্ষকের দায়িত্ব কর্তব্য ও নৈতিকতার বিষয়ে আমরা কতটুকু সচেতন! ‘যেই যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ’- কথাটির মতো আমরা শিক্ষকদের 'ডেমিগড' ইমেজের একটি অনৈতিক ফায়দা নেবার ব্যবস্থা করছি নাতো? আমাদের বয়ঃজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে তিন চার যুগ আগের শিক্ষকদের যে ভাবমূর্তি আমাদের দৃশ্যপটে প্রতীয়মান হয়, মিলিয়ে দেখলে তার কতটুকু এখন আমরা দেখতে পাই অথবা একযুগ আগে আমরা দেখতে পেয়েছি।
শিক্ষকের বেতের মার শিক্ষার্থীকে সঠিক পথ দেখাবে, এই নীতিতে আমার আশেপাশে কত সমবয়সীকে শিক্ষকের নিষ্ঠুরতার বলি হতে দেখেছি। আশার কথা, কর্তৃপক্ষ এই শারীরিক নিষ্ঠুরতা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু মানসিক নিষ্ঠুরতার পরিণাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা ভিকারুননিসা স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী আমাদের দেখিয়ে দিল!
সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষকদের প্রতি অভিভাবক অথবা শিক্ষার্থীদের যে বিরুদ্ধাচরণ আমরা দেখতে পাচ্ছি তা কি কেবল এক অরিত্রীর আত্মহননের ফল নাকি কোনো পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। নামী স্কুলগুলোর কোচিং বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, নম্বর বাণিজ্য এই শব্দগুলো কি নিছকই কাকতালীয়,  নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে কোনো নির্লজ্জ রূঢ় বাস্তবতা?
একজন সন্তান তার বাবা মায়ের সব থেকে দুর্বলতার জায়গা। আমি বলছি না কোনো শিক্ষার্থী অপরাধ করলে তাকে শাস্তি দেয়া যাবে না। অবশ্যই তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে এবং কোনো বাচ্চার অপকর্মের দায়ভার অবশ্যই তার বাবা মাকে নিতেই হবে। কিন্তু একটি বাচ্চার অনৈতিক কাজের দায়ভার কেবল তার একার নয়। প্রচলিত আইন ব্যবস্থাও এর স্বপক্ষেই যুক্তি দেয়।  তাই একটি বাচ্চাকে শাস্তি দেবার আগে তার পূর্বের কার্যক্রম, অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি, অপরাধের গভীরতা ইত্যাদি নিরূপণ না করেই টিসি দেবার বিষয়টিকে যথেষ্ট অনৈতিক ও নিষ্ঠুর বলেই মনে করছি।
আর একথাও সত্যি, কোনো সন্তানের অপকর্মের জন্য তার বাবা মাকে দায়ী করা গেলেও  সন্তানের চোখের সামনে তার বাবা মাকে অপমান করার বিষয়টি যথেষ্ট অনৈতিক ও প্রশ্নবিদ্ধ। বাবা মায়ের কাছে তাঁদের সন্তানের ভবিষ্যৎ সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ, আর এই দুর্বলতম জায়গাটির সুযোগ নিয়ে শিক্ষকরা অভিভাবকদের জিম্মি করে নিজেদের 'ডেমিগড' ইমেজটির যথেচ্ছ অপব্যবহার করছেন বলেই বোধ করছি। অভিভাবককে কোনো প্রকার ওয়ার্নিং অথবা বাচ্চার শুদ্ধির জন্য গঠনমূলক কোনো আলোচনা না করেই তাঁদের সাথে দুর্ব্যবহার অথবা টিসি নামক শোষণের অস্ত্রটির যত্রতত্র ব্যবহার করে মানুষ গড়ার কারিগর অথবা তাঁর প্রতিষ্ঠানটি  কেবল দায় সারতে পারেন না।
তবে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না আমাদের সমাজে এখনো অসংখ্য আদর্শ শিক্ষক রয়েছেন এবং শিক্ষার্থীরা যেন এই বিরুদ্ধাচরণটি তাদের অনৈতিক কাজের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে। আর আত্মহত্যার প্ররোচণা দেবার অপরাধে শিক্ষকের ফাঁসির দাবি করার বিষয়টির যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছি। কোনো শিক্ষক ইচ্ছাপূর্বক তার শিক্ষার্থীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবেন এতটা পচন আমাদের সমাজে ধরেনি বলেই বিশ্বাস করি।
বরং, এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর না ঘটে সেই নিমিত্তে কার্যকরী ও যুগোপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, শিক্ষাবিদ ও শিশু মনোবিজ্ঞানীদের যথাযথ দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
মানুষ গড়ার কারিগরদের বিরুদ্ধে যখন আমরা আঙুল তুলছি, শিক্ষক যখন জনতার আদালতে, বিচারক হিসেবে আমাদের নৈতিক অবস্থানটিও এক্ষেত্রে যথেষ্ট দৃঢ় হবে এমনটিই প্রত্যাশা। দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ বার্ট্রান্ড রাসেলের প্রবন্ধ গ্রন্থ 'On Education' এর উক্তি টেনে শেষ করতে চাই- ‘ছাত্রকে যা শেখানো হয় তা যদি মূল্যহীন হয় আর যারা শিক্ষা দেবেন তারা যদি হন নিষ্ঠুর অত্যাচারী, তবে শিশু স্বভাবতই শহরের বিড়ালছানার মতো আচরণ করবে। একদিকে অতিরিক্ত আদর ও তত্ত্বাবধান তাকে করে তুলবে পরনির্ভরশীল, অপরদিকে নিষ্ঠুর শাস্তি ও অবিচার তাকে করে তুলবে পাষণ্ড, অমানুষ!’
নকল ও আত্মহত্যার মতো অনৈতিক কাজের দায়ভার আমরা তার বাবা মাকে,  তার শিক্ষককে অথবা সেই শিশুটিকে এককভাবে দিতে পারি না। বরং এই দায়ভার সকলকেই নিতে হবে।
পরিমিত আদর ও ন্যায়সঙ্গত শাসনই একমাত্র হতে পারে শিশুর সঠিক বিকাশের হাতিয়ার। আর এই ক্ষেত্রে অভিভাবক আর শিক্ষকদের পরস্পরের সহযোগী হিসেবে কাজ করতে হবে, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।
লেখক: মানসুর শোভন

আরও সংবাদ

বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop