মুক্তকথাএকদা আমিও শিক্ষক ছিলাম

সময় সংবাদ

fb tw
somoy
নূরুজ্জামান বিশ্বাস
 
বাংলাদেশে ১০ বছর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতা করেছি। প্রবাসে আসার পূর্বে (২০০৬ থেকে ২০১১ এর মে পর্যন্ত) যথাক্রমে বিবিএ ও এম বি এ প্রোগ্রামের Program coordinator ছিলাম। শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে অনেক অভিজ্ঞতা ও অনেক স্মৃতি মনে হলে প্রবাসে নিজের অজান্তে নিজে নিজে ফিরে যাই অতীতের সেই দিনগুলোতে। হারিয়ে যাই এবং অনুভব করি সেই সময়টাকে। প্রবাসে একজন শিক্ষককে বা শিক্ষকতা পেশাকে খুব মিস করি।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যেকটি ব্যাচে ২/৩ টি সেকশনে ক্লাশ হত। আমার কোর্সের ক্লাসগুলো আমি সাধারণত একত্র করে বড় রুমে নিতাম। বিশেষ করে, research methodology ও Bio Statistics কোর্সের ক্লাসগুলো আমি বড় রুমে নিতাম, ৮০–৯০ জনের ক্লাসে ২ ঘণ্টা পর্যন্ত ক্লাশ নিতাম। ফল সেমিস্টারের কোন একদিনে সকাল ৮–১০টা ক্লাশ নিচ্ছিলাম। ৩০ মিনিট পর হঠাৎ পিছনের সারির দিকে আমার নজর যায়। ফিস ফিস, মৃদু গুঞ্জন আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট করলে আমি পিছনে চলে আসি।
আমার কিছু টেকনিক ছিল সবচেয়ে দুর্বল ছাত্র/ ছাত্রীর দিকে রাগত দৃষ্টিতে তাকালে ভয়ে অনেক সত্য বের হয়ে আসত। এবারও তাই করলাম। ছাত্রীটি ফিস ফিস করে বলল পিছনের বেঞ্চে কারও ব্যাগে ফেন্সিডিল আছে। আমি পিছনে চলে আসি এবং আবারও সেই টেকনিক এপ্লাই করি । এবার নাম পেয়ে গেলাম, মিন্টু (ছদ্ধ নাম, সঙ্গত কারণে তার আসল নাম ও ব্যাচ প্রকাশ করা হল না)। আমি ছাত্রটির সামনে চলে আসি। তার সামনে এসে আই কন্ট্রাক্টের চেষ্টা করি এবং ঘটনার সত্যতা জানতে চাই। একটি ছাত্র যেখানে ক্লাশে ব্যাগে করে বই খাতা নিয়ে আসার কথা সেখানে সে ব্যাগে করে মাদক নিয়ে আসতে পারে –এটা আসলে আমার ধারনায় ছিল না। যাই হোক, ছাত্রটি ক্লাসে ব্যাগে করে মাদক নিয়ে এসেছে অথচ তার মাঝে কোন ধরণের অপরাধবোধ নাই। আমি ওকে বললাম “তুমি যে অন্যায় করেছ তার পরিণাম/ শাস্তি কি তুমি জান? “ও নির্ভয়ে ও সোজা সাপ্টা জবাব দিল, কি করবেন, ক্লাশ থেকে বের করে দিবেন? বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দিবেন, নাকি পুলিশে দিবেন?” আমি ওর মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরে নিজেকে সামলে নিয়ে ভারী গলায় বললাম,” ক্লাশে আসছ শেখার জন্য, তোমাকে বের করে দিলে কাকে শিখাব আর শিখবা বা কি করে? বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেয়ার ক্ষমতা আমার নেই, পুলিশে দিলে তোমার সাথে আমার ও আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটা পত্রিকায় আসবে। অতএব এর কোনটাই আমি করছি না। তোমার ব্যাগটা আমাকে দাও। ক্লাশ শেষে আমার সাথে কথা বলে আমার রুম থেকে ব্যাগ টা নিয়ে নিবা”।
ও সুবোধ বালকের মত আমার কথা শুনল । আমি ক্লাশটি সংক্ষেপ করে রুমে চলে আসি। ওয়াশ রুম থেকে বের হতেই পিয়ন নাম উল্লেখ করে বলল সে বাইরে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি মিন্টুকে নিয়ে পাশের রুমে যাই এবং পিয়নকে আমার নাস্তাটা ওখানে দেবার জন্য বলি। বেশীর ভাগ ছাত্ররা যেহেতু হোস্টেল ও ম্যাচে থাকে তাই নিশ্চিত হবার জন্য জানতে চাইলাম ও কোথায় থাকে এবং নিশ্চিত হলাম সে বাসায় থাকে। এতবড় অপকর্মের জন্য ওর মাঝে সামান্যতম অনুভূতি নেই। আমি আমার অবস্থান বদলিয়ে সামনা সামনি বসলাম। সকালে নাস্তা খেয়েছে কিনা জানতে চাইলে মিন্টু না সূচক জবাব দেয়। আমি আমার নাস্তাটা ওর দিকে এগিয়ে দেই এবং নিচু গলায় জিজ্ঞেস করি, তোমার মা সকালে নাস্তা বানায়নি? মার কথা জিজ্ঞাস করতেই ওর চোখ ভারী হয়ে গেল এবং চোখ দিয়ে পানি গড়াতে লাগল। না থেমে বলতে লাগল “মা একজনের সাথে চলে গেছে, বাবা আর এক মেয়ের সঙ্গে সংসার শুরু করেছে”। তাই ধানমণ্ডিতে নানীর বাসায় থাকে। ওর মামি এবং অন্যান্য আত্মীয়রা ওকে নিয়ে প্রতিনিয়ত কানা ঘুসা করে যা ওকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।
ওর কথাগুলো শুনে আমি অনেকটা নির্বাক হয়ে যাই। কিছুক্ষণ নিরব থাকলাম। আবার মিন্টুই বলা শুরু করল। আমার জায়গায় আপনি হলে কি করতেন? আসলে আমিও ভাবছি, ওর জায়গায় আমি হলে কি করতাম! ওর মাথায় হাত রাখালাম। ওর চোখ দিয়ে পানি গড়াচ্ছে। বললাম, তোমার জায়গায় আমি হলে কি করতাম জানি না। হয়ত তুমি যা করছ তার চেয়ে খারাপ কিছু করতাম। তোমার হারানো কিছুই আমি ফেরত দিতে পারব না । তবে তোমার সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য তুমি চাইলে কিছু করতে পারি। তোমার বাবা মা তারা তাদের সুখ বেছে নিয়েছে। তারা তোমার কথা চিন্তা করেনি। তুমি যদি এখন তোমার জীবনকে নষ্ট কর এর জন্য তুমি দায়ী থাকবা। ওকে বুঝাতে সক্ষম হলাম, ওর জীবনটা গড়ার দায়িত্ব ওর নিজের। নিয়মিত ক্লাশ করার জন্য বলে আমি আমার রুমে চলে আসি। অফিসে গিয়ে ওর ফাইল খুঁজে কন্ট্রাক্ট পার্সনের সাথে কথা বলে ওর ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হলাম। ওর মামা সব খুলে বলল। আমি প্রায়ই ওর পড়ালেখার খোঁজ খবর নিতাম।
২০১১ তে কানাডা আসার কয়েকদিন পূর্বে একটি আননোন নাম্বার থেকে কল পাই। ছেলেটি আমার সঙ্গে দেখা করে। টগবগে যুবক। বোঝার উপায় নাই, তার এমন একটি অতীত ছিল বা আছে। আমাকে একটি সুন্দর গিফট দিল (শার্ট ও টাই) এবং এয়ারপোর্টে যেতে কোন হেল্প লাগলে ওকে যেন জানাই। ছেলেটিকে দেখে এবং শুনে খুব ভাল লাগল যে সে ভাল একটি জব করে। আসলে শিক্ষক হিসেবে আমাদের অনেক দায়িত্ব আছে। ছেলেটিকে আমি ক্লাশ থেকে বের করে দিতে পারতাম, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেয়ার সুপারিশ করতে পারতাম অথবা পুলিশে দিতে পারতাম। পরিণামটা কি হত? এই ছেলেই হয়ত একদিন বেছে নিত চরমপন্থী (মাদকসেবী বা ছিনতাইকারী দলের সদস্য বর্তমানে জঙ্গি) । এর দায় কিন্তু আমরা এড়াতে পাড়ি না। সমাজ গঠনে একজন শিক্ষকের অনেক দায়বদ্ধতা আছে। আমি আমার অনেক সিনিয়র (প্রফেসর এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসিসহ অনেকে ) সহকর্মীর কাছে উদাহরণ হিসেবে এর সমাধান চাইলে তাদের উত্তর ছিল, “এরা বিশ্ববিদ্যালয়কে পলিউট করার পূর্বে এদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ক থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করা উচিৎ” । তবে কারও কাছে এ ঘটনাটি প্রকাশ করিনি।
৮০ দশকের শেষের দিকে এবং ৯০ এর দশকের শুরুর দিকে এসএসসিতে a good teacher এর উপর একটি প্যারাগ্রাফ প্রায়ই কমন ছিল। সেখানে উপসংহারে লিখতাম, একজন ভাল শিক্ষক ছাত্রদের একাধারে একজন অভিভাবক একজন দিক নির্দেশনাকারী, একজন ভাল বন্ধু, একজন মনোবিজ্ঞানী এবং একজন ডাক্তার ।
একজন ছাত্র/ ছাত্রীর গতিবিধি একজন শিক্ষকই প্রথম ধরতে পারেন এবং তিনি যদি সেভাবে গাইড করেন তাহলে অবশ্যই তাকে একটি সুন্দর জীবন উপহার দিতে পারেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি ১০ জন ছাত্রের জন্য একজন গাইড টিচার ছিলেন। তিনি সপ্তাহে প্রত্যেক ছাত্রের রিপোর্ট প্রদান করতেন। যাতে করে একজন ছাত্র / ছাত্রীর ট্রেন্ড সহজেই বুঝতে পারতাম।
একটি সুন্দর সমাজ নির্মাণে আমাদের সবারই দায়িত্ব আছে। তবে শিক্ষক সমাজের দায়িত্বটা আরও বেশী। সমাজটি নষ্ট হয়ে গেছে বা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে নিজেকে নিরাপদ দূরে রাখছি। অদূর ভবিষ্যতে আমরা কেউই এই নষ্টামির হাত হতে নিরাপদে থাকতে পারব না।
নূরুজ্জামান বিশ্বাস
সাবেক শিক্ষক  ও কলামিস্ট
 
 

আরও সংবাদ

বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop