মুক্তকথাঅরিত্রি ও আমাদের ‘ঘুনে ধরা’ শিক্ষাব্যবস্থা!

সময় সংবাদ

fb tw
somoy
সাদিয়া জাফরিন খাঁন
 
একজন অরিত্রিকে যখন আত্মাহুতি দিয়ে প্রমাণ করতে হয় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার দরকার। অন্যদিকে আমাদের ভাবায়, এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কতটা আবেগী। অনেকে হয়তো বলবে- বেয়াদব, অভদ্র অথবা প্রগতিশীলরা শিশুদের উগ্রে দিচ্ছে তাদের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে। আরো অনেক ধরনের মতামতও আছে।  
কয়েকদিন আগেই রাজউক কলেজের নবম শ্রেনীর ইথিকা সিঁড়ি থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করল। যা নিয়ে আমরা খুব বেশি কথা বলিনি-কারণ, সোশ্যাল মিডিয়াতে তেমন আলোচনায় আসেনি বা ভাইরাল হয়নি খবরটি। ইথিকার দোষ ছিলো- তার পরীক্ষার খাতায় শিক্ষকের দেয়া নম্বরের উপর নিজে লিখে নম্বর বাড়িয়েছিলো এবং সেটা শিক্ষক ধরে ফেলেছিলেন। ইথিকার কাজটি যে সম্পূর্ণ নৈতিকতাবিরোধী- সেটি অন্যদের মতো আমিও অকপটে স্বীকার করছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শিক্ষক তাকে কি এমন শাস্তি দিতো যা মৃত্যু থেকে ভয়ঙ্কর। যার কারনে ইথিকার মনে হল মরে গেলে সব সমস্যার সমাধান হবে।
হ্যাঁ জানি, এই প্রশ্নের উত্তর মেলানো খুব একটা কঠিন কাজ নয়। আপনি একটু ভালোভাবে বিষয়টা পর্যালোচনা করেলেই দেখবেন কয়েকটি বিষয় বেরিয়ে আসবে। যেমন- শিক্ষক ছাত্রকে কোথায় কিভাবে শাসন করছে, শিক্ষক বাসায় নালিশ করার সময় কি বলবে এবং কিভাবে বলবে, নালিশ করার পর বাবা মা তার সন্তাণের সাথে কেমন আচরণ করবে- এই তিনটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
কোন ছাত্র বা ছাত্রী কোন অন্যায় করার পর একজন শিক্ষক তার তীব্রতার উপর নির্ভর করে তার সাথে আলাদাভাবে কথা বলা উচিত এবং তার যে শাস্তি প্রাপ্য তাকে দেওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের দেশের স্কুল কলেজে দেখবেন ঠিক তার উল্টো। কেউ কোন ভুল করলে সেটা নিয়ে শ্রেনিকক্ষে সবার সামনে তাকে হেনস্তা করা হয়। তার পরিবার নিয়েও বিভিন্ন প্রশ্ন তোলা হয়। শুধু তাই নয়, হয় আরো অনেক কিছু।
এর প্রভাবেই সহপাঠিরা তার সঙ্গে আর আগের মত আচরণ করে না। ভুল কিংবা অন্যায়ের কারণে সাজাপ্রাপ্ত ছাত্র বা ছাত্রীটি প্রতিনিয়ত একটা মানুষিক চাপের মধ্যে দিয়ে যায়। যে বয়সে একজন কিশোর বা কিশোরী পরিবেশ বা আশেপাশের মানুষ থেকে শিখবে নৈতিকতা, মহত্যবোধ তার বদলে সে শেখে মানুষকে হেয় করা, নিজের ভুল না শুধরে অন্যের ভুল দেখা ইত্যাদি। 
আমাদের দেশে স্কুল কলেজের একজন শিক্ষক যখন বাসায় অভিভাবকের কাছে নালিশ করে তখন তিনি কিভাবে করেন বা কি বলে নালিশ করেন এবং তখন তার বক্তব্য যদি ভুলভাবে উপস্থাপিত হয় বা অন্যায়ের তীব্রতা নিরুপণ ঠিক না থাকে তাহলে বাচ্চাটির উপর কি ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে সেটা আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে ভালোভাবে জানি এবং বুঝি।
এক্ষেত্রে অনেকে বলতে পারেন বাচ্চা ভুল করলে অবশ্যই বাসায় নালিশ করবে। এটা না করলে তো বাচ্চা বিগড়ে যাবে। কিন্তু আপনি আপনাকে ঐ বাচ্চার স্থানে রেখেই একবার চিন্তা করুন যে আপনি একটি ভুল করলেন তারপর আপনার শিক্ষক আপনাকে না বুঝিয়ে সরাসরি আপনার অভিভাবকের কাছে নালিশ করে দিলে আপনি আরো রেগে যাবেন নাকি ঠিক হয়ে যাবেন? আমি হলে আরো রেগেই যেতাম।    
এরপর শিক্ষক নালিশ করার পর অভিভাবক কিভাবে আচরন করেন তার সন্তানের সাথে এই  বিষয়ের উপর নির্ভর করে একটি বাচ্চার অনেক চারিত্রক বৈশিষ্ট্য। একজন সন্তান যদি তার বাবা মাকে সত্যি কথাটা বলার সাহস না রাখে তাহলে বুঝতে হবে বাবা মার আচরনে কিছু অসঙ্গতি আছে বলেই তাদের সন্তান কথা লুকাচ্ছে। কারণ বাবা মায়ের অতিরিক্ত শাসন কখনো সন্তানের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না। আজকালকার মায়েরা তাদের বাচ্চাদের পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে যে ধরনের প্রতিযোগীতা করে সেটা দেখলে তো মনে হয় আসলে পরীক্ষা দিচ্ছে তারা।
এই অসুস্থ্য প্রতিযোগীতায় শিশুরা ভুল ধারণা পায়। শিশুদের কাছে মনে হয় পড়ালেখার আসল উদ্দেশ্য আসলে পরীক্ষায় শুধু বেশী নাম্বার পাওয়া যার ফলে সে তার জীবনকে একটি ছোট বিষয়ের চেয়েও মুল্যহীন ভাবে। অনেক ছেলেমেয়ে বাবা মায়ের কাছে পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে মিথ্যা কথা বলতেও কুন্ঠাবোধ করে না কারন তারা ধরেই নেয় সত্যি নম্বর বললে বাবা মা তাদের চেয়ে বেশী ভেঙ্গে পড়বে। আশেপাশের প্রতিবেশীদের কাছে মুখ দেখাতে পারবে না, সম্মানের ঘাটতি দেখা দেবে ইত্যাদি।  
এখন ফিরে আসি ইথিকার সাথে কি এমন হয়েছিলো যে সে মরে গিয়ে বেঁচে গেলো সে বিষয়ে। একটি স্কুলে কি এমন সিস্টেম আছে বা নিয়ম আছে যেখানে একটি বাচ্চা একটা ভুল করে ফেললে তাকে শুধরে দেয়ার বদলে সাথে সাথে অভিভাবক ডাকতে হয় এবং সেই ভয়ে বাচ্চাটি মরণকে বরন করে নেয়। তাতে কি সমস্যাটি সমাধান হয়ে গেলো? ইথিকার পরীক্ষার খাতার নম্বর বেড়ে গেলো নাকি শিক্ষক ইথিকাকে সঠিক শিক্ষা দিতে পারলেন অথবা ইথিকার বাবা মা প্রতিবেশী, ইথিকার সহপাঠীদের বাবা মায়ের কটুকথা থেকে মুক্তি পেলো ?
এরপর ভিকারুন্নেসার অরিত্রি যে পরীক্ষার হলে মোবাইলে নকল করলো যার ফলে তার বাবা মাকে ডেকে অসম্মান করা হল এবং পরিশেষে সে মৃত্যুকেই তার মুক্তি হিসেবে মেনে নিলো, আমার প্রশ্ন হল এতো নাম করা স্কুলের শিক্ষকরা তাহলে কি পড়ালেন যে অরিত্রিকে পরীক্ষায় নকল করতে হয়। এবং পরীক্ষায় কম নম্বর পেলে কি এমন শাস্তির বিধান আছে যার ভয়ে তাকে এই ভুল পথ বেছে নিতে হল।  
আসলে শুধু শিক্ষক কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থা করে এই ঘুনে ধরা শিক্ষা এবং সমাজব্যবস্থা বদলানো খুব কঠিন। সবার আগে বদলাতে হবে নিজেকে যার যার জায়গা থেকে সে একজন অভিভাবক হন বা একজন শিক্ষক হন।
 
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা, গ্রো ইউর রিডার 

আরও সংবাদ

বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop