ksrm

মুক্তকথাঅনিল বাগচীর একদিন ইতিহাসকে আরও একবার ছুঁয়ে দেখুন

সাব্বির সামি

fb tw
somoy
প্রিয়াংকা বিশ্বাস: 'অনিল বাগচীর একদিন' বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি অসামান্য চলচ্চিত্র যা মুক্তি পায় ২০১৫ সালে। কালজয়ী এবং জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন 'আমার বন্ধু রাশেদ' ও 'দিপু নাম্বার টু'সহ অসংখ্য ভিন্নধর্মী ছবির নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম। আজ আমরা 'অনিল বাগচীর একদিন' মুভিটির রিভিউটি জেনে নেবো এবং সবশেষ দেখবো পুরো মুভিটি।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা, নির্মমতা, নৃশংসতা, সমসাময়িক সমাজের অবক্ষয়, অনিশ্চিত জীবনযাত্রা সর্বোপরি মানবতার এক অপূর্ব মিশেলে সমগ্র কাহিনী প্রবাহিত।
বইয়ের অক্ষরকে সেলুলয়েডের পাতায় চিত্রায়িত করতে পারার মুন্সিয়ানা পরিচালক দেখিয়েছেন। বলে রাখা আবশ্যক, হুমায়ূন আহমেদ এঁর মৃত্যুর পর তাঁর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এটিই প্রথম চলচ্চিত্র এবং আমরা এই বিষয়ে অবগত যে তাঁর কাহিনীকে চলচ্চিত্রে রূপ দেয়া সহজসাধ্য বিষয় নয়। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম এটি নিয়ে তৃতীয়বারের মতো হুমায়ূন-সাহিত্য অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেন।
সব থেকে আনন্দের সংবাদ হল, চলচ্চিত্রটি ৪০তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অনুষ্ঠানে ৬টি বিভাগে পুরস্কৃত হয়। পরিচালকের সার্থকতা এবং কাজের পরিতৃপ্তি তো এখানেই I
যাই হোক, এবার আসি তবে মূল প্রসঙ্গে:
অনিল বাগচী - নবাগত আরেফ সৈয়দ
আইয়ুব আলী(সহযাত্রী)- গাজী রাকায়েত
অতশী(অনিলের বোন)- জ্যোতিকা জ্যোতি
আইয়ুব আলীর স্ত্রী - ফারজানা মিঠু
সুরেশ বাগচী(অনিলের পিতা)-তৌফিক ইমন
অনিল বাগচী ২৬ বছরের একজন যুবক যে কিনা শৈশব থেকেই ভীতু এবং নরম স্বভাবের। সে ঢাকার একটি ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে কর্মরত এবং মেসে থাকে,ঢাকায় তার কোন আত্মীয়স্বজন নেই। তার স্কুল শিক্ষক পিতা এবং বড়বোন আতশী থাকে রূপেশ্বর গ্রামে। যুদ্ধের তখন মাঝামাঝি সময়কাল, পিতাকে গ্রামের বাড়িতে বেশ কয়েকটি চিঠি পাঠিয়েও কোন উত্তর আসেনি আর। সবসময়ই চিন্তাগ্রস্ত এক অনিলকে আমরা খুঁজে পাই।
স্বপ্নদৃশ্যের মধ্যদিয়ে পর্দায় কাহিনী শুরু হয়, ভয়ে ঘুম ভেঙে ধড়মড় করে উঠে বসা অনিল পিতার কথা স্মরণ করে। তিনি যেন সামনে এসে বলছেন - 'অত ভয় পাচ্ছিস কেন? তোকে যে কথাটা বলেছিলাম মনে নাই? Cowards die many times before their death? ভীতুদের মৃত্যুর আগেও অনেকবার মৃত্যুবরণ করতে হয়! শেক্সপীয়রের কথা। প্রতিদিন মনে মনে কয়েকবার কথাটা উচ্চারণ করবি। দেখবি ভয় কেটে যাবে । "সুতরাং কাহিনীর শুরু থেকেই অনিল চরিত্রের ভীতু-সন্ত্রস্ত দিকের সাথে আমাদের পরিচয় ঘটে।
পরদিন ভোর হতেই মেসের প্রতিবেশী গফুর সাহেব অনিলের হাতে একটি চিঠি ধরিয়ে দেন। রূপেশ্বর হাইস্কুলের হেডমাস্টার মনোয়ার উদ্দিন খাঁ সাহেব চিঠিতে জানান, এপ্রিলের ৯ তারিখে রূপেশ্বরে আসে পাক-মিলিটারি যাদের আকস্মিক আগমনে গ্রামবাসী অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। এপ্রিলের বারো তারিখে তারা আরো অনেকের সঙ্গে অনিলের পিতাকে হত্যা করে।
কাহিনীর এই পর্যায়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনার একটি দৃশ্য ফুটে উঠেছে। মেস-প্রতিবেশী গফুর সাহেব পিতার মৃত্যু-শোকে হতবিহ্বল অনিলকে বলেন - "আমি জানি এই অবস্থায় সান্ত্বনা দেয়াটা খুব খারাপ শোনাবে। তারপরও আমি কোরান শরীফ পড়ে খাস দিলে তোমার বাবার জন্য দোয়া করবো। আলাদা করে তার জন্য নফল নামাজ পড়বো। " এই বলে তিনি নিজ কক্ষে ফিরে গিয়ে জায়নামাজে বসেন। মানবিকতা এবং সম্প্রীতির এই দৃশ্য চোখে জল এনে দেয়।
আমরা একটি বিষয় খেয়াল করি, অনিল পিতার মৃত্যু সংবাদ পাবার পর ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহবল হয়ে পড়লেও নিজেকে সামলে নিয়ে পিতার দেয়া পুরনো চিঠি পাঠ করে অফিস এবং রূপেশ্বরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। বড় রাস্তার মোড়ে মিলিটারি জটলার সম্মুখে পড়লে সে মিলিটারি সেনার মুখোমুখি হয় এবং বিদেশী সাংবাদিককে সে প্রাণের মায়া না করে দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সম্পর্কে জানায়, জানায় মিলিটারিদের হাতে তার পিতার মৃত্যুর খবর।
কপালগুণে সাংবাদিক থাকায় মিলিটারিরা তাকে তীব্র আক্রোশ চেপে চলে যেতে বলে, না হলে এটাই হতো তার জীবনের অন্তিম মুহূর্ত। আসলে পিতার আদর্শে বড় হওয়া অনিল কখনো মিথ্যা বলতে শেখেনি,এটাই ছিল তার পিতার গর্বের জায়গা। "সততা" নামক এই গুণটি তার ভেতরে গেঁথে দেয় তার পিতা। সেটি আমরা সিনেমা চলাকালীন সময়েও জানতে পারি।
একমাত্র বোন অতশী গ্রামের হেডমাস্টারের বাড়িতে আশ্রিত এবং বোনের দায়িত্ব বুঝে নেয়াই তার বর্তমান লক্ষ্য। সেই উদ্দেশ্যই তার রূপেশ্বরের পথে যাত্রা। যাত্রাকালে পরিচয় ঘটে আইয়ুব আলীর সঙ্গে যে কিনা স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছেন শ্যালকের বিবাহ অনুষ্ঠানে এবং এই যুদ্ধের সময়ে বিবাহ করার মতো নির্বুদ্ধিতার জন্য তার অভিযোগের অন্ত নেই। বাকপটু এই মানুষটি অল্প সময়েই অনিলকে আপন করে নেন এবং যখন জানতে পারেন অনিল হিন্দু তখন তাকে পরিচয় লুকিয়ে রাখতে অনুরোধ করেন।
পথিমধ্যে বাস থামিয়ে সবাইকে নামিয়ে মিলিটারিরা যখন জেরা করতে শুরু করলো তখন পিতার আদর্শে গড়ে ওঠা অনিল সত্যকে প্রকাশ করলো, কিন্তু আইয়ুব অনিলের হয়ে মিথ্যা বললো যে তার নাম "মহসিন", সে হিন্দু নয়।
নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে সে অনিলকে বাঁচাতে চাইলো। কিন্তু অনিল সত্যের পথে অটল থাকলো এক বুক সাহস আঁকড়ে! তার ভীতু সত্তা এত সাহস কোথায় পেলো? মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, স্বজন হারানোর ক্ষোভ মানুষকে নির্ভীক এবং বিপ্লবী করে তোলে, অনিল ছিল তার প্রমাণ।
আইয়ুব বাসে ফিরে যেতে যেতে পিছন ফিরে মাত্র কয়েক ঘণ্টার পরিচিত অনিলের বোনের দায়িত্ব নিলো। আইয়ুব বলেছিলেন - 'আল্লাহপাকের কসম খেয়ে বলতিছি, মাটির কসম খেয়ে বলতিসি, আপনার যদি কিছু হয় আমি আপনার বোনকে দেখবো। যতদিন বাঁচি দেখবো, আমার কথা বিশ্বাস করেন, বিশ্বাস করেন আমার কথা।'
এই আকুতিপূর্ণ প্রতিজ্ঞা মানবতার জয়ধ্বনি। অনিলের ভাগ্যে কী হলো সেটি আমি বলবো না। কেবল মানবিক সম্পর্কের ঊর্ধ্বে ব্যক্ত এই অনুভূতিগুলো আঁকড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলবো।
অনেকটা গল্প হলেও সত্যি এমন অনেক ঘটনার সময়কালই তো ছিল আমাদের একাত্তর। আজন্ম ভীতু স্বভাবের অনিল মিলিটারির সামনে কেন মৃত্যু ভয়ে ভীত হয়নি সে ব্যাখ্যা হয়তো পরিচালক দেননি, কিছু বিষয় বিশ্লেষণ করেই আয়ত্ত করা শ্রেয়। তবে হুমায়ূন আহমেদ তাঁর উপন্যাসে ব্যাখ্যাটা তুলে দিয়েছিলেন এভাবে - 'অনিল অসম্ভব ভীতু। কিন্তু বাবার চিঠি বুকে নিয়ে সে মিথ্যে বলতে পারছে না ,সত্যি তাকে বলতেই হবে।'
কেন্দ্রীয় চরিত্র থেকে শুরু করে অন্যান্য চরিত্রের অভিনয় ছিল প্রশংসনীয়। তবে সবাইকে ছাপিয়ে গেছেন গাজী রাকায়েত "আইয়ুব" চরিত্রের মধ্য দিয়ে। তিনি কখনো হাসিয়েছেন আবার কখনো বিষণ্ণতায় ডুবিয়ে নিয়েছেন। পুরোটা সময় জুড়ে তিনি ছিলেন দুর্দান্ত। সুরেশ বাগচীর অভিনয় আরও একটু সাবলীল হলে ভালো হতো। তবে কোন চরিত্রকেই আমার কাছে আরোপিত মনে হয়নি, সবাই-ই নিজ গুণের প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
চলচ্চিত্রর দৃশ্য ধারণ কৌশলগুলো ছিল অনবদ্য। বিশেষ করে সাদাকালো এবং রঙিন এই দুটি ইফেক্ট এর ব্যবহার। যুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়কাল এবং অনিলের ভাবনা জগত ছিল রঙিন। আর যুদ্ধকালীন সময়ে বাঙালির অনিশ্চিত জীবনে যে কোন রঙের ছটা ছিলনা সেটি পরিচালক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন।
সাদাকালো জীবনে তখন তো ছিল একটাই রং দেশ স্বাধীন হবে, লাল-সবুজের পতাকা উড়বে আকাশ তলে , দেশ স্বাধীন হবে ,বিজয় গাঁথা রচিত হবে মুখে মুখে, বর্ণিল আনন্দ মুছে দিবে পুষে রাখা সমস্ত শোক। সবাইকে দেখার আমন্ত্রণ রইলো, ইতিহাসকে আরও একবার ছুঁয়ে দেখার আমন্ত্রণ রইলো।
লেখক: প্রিয়াংকা বিশ্বাস (সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)
দেখে নিন মুভিটি:

আরও সংবাদ

বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
ভাইরাল
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
Latest News
আপনিও লিখুন
ছবি ভিডিও টিভি
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop