মুক্তকথাঝিমিয়ে পড়া রক্ত উঠুক জেগে

প্রান্তী সারোয়ার

fb tw
somoy
 
আসা যাওয়ার পথে বরাবরই উদাসীন আমি। কিন্তু ছোট ছোট অনেক বিষয় আমার নজর এড়ায় না। জানি অনেক কিছু করবার ক্ষমতা আমার নেই, কিন্তু নিজের খারাপ লাগা থেকে বের হতে খানিকটা সময় লেগে যায়। বাসায় আসা যাওয়ার পথে ছোট একটা দোকান সামনে পড়ে, সেখান থেকেই টুকটাক জিনিস কেনা হয়। দোকানটা খুবই ছোট, সব মিলিয়ে দোকানে হয়ত ৫০ হাজার টাকার জিনিসও নেই। সে দোকানটা থেকে যখনই কিছু নেই, পাশে দাঁড়িয়ে থাকে ছোট একটা বাচ্চা ছেলে।    
 
ছেলেটার চুলগুলো সবসময় উসকো খুশকো থাকে, শরীরে জমে থাকে ময়লা। আর সবসময় ও কিছু না কিছু একটা করতেই থাকে। বাবা-মার কথা শোনেও না ঠিকমত। আমি ঠিক যখন অফিস থেকে ফিরি তার কিছুক্ষণ আগেই ছেলেটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, এবং দোকান থেকে কিছু না নিলে বলে, আপা নিবেন না কিছু? আমার কিছু নেয়ার হলে নেই না হলে ফেরত চলে যাই। দু চারটা কথা হয় তখন ওর সাথে।  
 
যাইহোক একদিন ছেলেটিকে বলছি তুমি গায়ে হাত পায় তেল-ক্রিম লাগাবা। চুলগুলো পরিপাটি করে রাখবা, আর পরিষ্কার জামা পরবা। তখন দোকানে থাকা ঐ ছেলেটার মা পাশ থেকে বলে উঠে, আপা কারে কী যে বলেন! ও তো কথা শোনা জাত না। তখন আমিও হেসে বললাম শুনবে আস্তে আস্তে।
অবাক করা বিষয় হলো যেদিন ঐ কথা বলছি ঠিক তার পরদিন অফিস থেকে ফেরার পথে দোকান থেকে কিছু নেওয়ার সময় দেখি ছেলেটা দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে এসে বললো আপা আমি আজকে হাত পায়ে তেল দিছি, জামাটাও দেখলাম বার বার ঝাড়ছে, অন্যদিন চিমটি কাটলে মনে হয় কাপড় থেকে ময়লা বের হবে, সেদিন দেখলাম ওর জামাটা মোটামুটি পরিষ্কার। আর চুলেও তেল দিয়ে বেশ সিঁথি কেটে আঁচড়েছে। আমি মনে মনে হাসলাম, আর মুখে প্রশংসা তো করতেই হলো।   
রাতে অফিস থেকে ফেরার পথেই ছেলেটির সঙ্গে আমার দেখা হয়। আমিও অন্য দোকান থেকে কিছু নেই না। ঐ পিচ্চিদের পারিবারিক দোকান থেকেই নেই।  একটা বিষয় প্রায়ই চোখে পড়ে। প্রায়ই দেখি মোটা করে একটা লোক তার দলবল-পেয়াদা নিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে। তারা ওই ছোট্ট দোকান থেকে ইচ্ছে মত এটা নেয়, সেটা নেয়, কিন্তু কখনো টাকা দিতে দেখি না। এটা নিয়ে তেমন করে ভাবিনি কখনো। হঠাৎ গত রাতে যখন বাসায় ফিরছি ঐ পিচ্চিটা আমাকে আসতে দেখে দৌঁড়ে গিয়ে আমার কাছে গিয়ে বলে আপা একটু আস্তে যান ঐখানে বাড়িওয়ালা আছে। আমি ওর মাথার চুলগুলো নেড়ে দিয়ে বললাম, তো কী  হইছে?
  
ও আমার হাতটা টেনে ধরে বললো আপা যাইয়েন না। চোখ-মুখে একটা আতঙ্ক যেনো। আমি বললাম আসো আমার সঙ্গে। পরে ও আমার পিছনে পিছনে লুকিয়ে এক পা দু পা করে আগায় । কেনো ভয় পায় তা আমি জানি না, জানার চেষ্টাও করিনি। দোকান থেকে কিছু নেবার সময় দেখলাম ঐ মোটা লোকটা একটা একটা করে অনেক জিনিস নিচ্ছে। শেষে টাকা না দিয়ে একটা খাতায় বিল লিখে রেখে চলে গেলেন।
 
খাতাটা আমার চোখে পড়ে দেখলাম বেশ অনেকগুলো পাতা ভরে গেছে বাকির লিস্টে। কোথাও পরিশোধ কথাটা চোখে পড়লো না। গত কয়েকমাসের নিয়মিত কেনাকাটার পর ঐ দোকানদার ও তার পরিবার আমাকে আর পর ভাবে না। আমি তাদের কাছে এতদিনের পরিচয়ে শুধু একজন ক্রেতা নই। তাই আমার প্রতি তাদের আন্তরিকতাও বেশ। 
তাদের দুঃখের কথা জানতে গিয়ে বুঝলাম আসল ঘটনাটি কী। যে লোকটি নিয়মিত বাকি নেয় সে লোকটিই ওই ছোট্ট দোকানের বাড়িওয়ালা। সেই বাড়িওয়ালা জিনিস নেয় এবং টাকা না দিয়ে বাকির খাতায় তা টুকে রাখে। এইভাবে জমতে জমতে টাকার অংকটা অনেকখানিই বেড়ে গেছে এখন। যেখানে দোকানের মোট সম্পদের দামই ৫০ হাজার টাকা হবে না সেখানে এই এক বাড়িওয়ালা 'ক্রেতা'র কাছেই ৩০ হাজার টাকা বাকি পড়ায় এই গরীব পরিবারটির করুণ অবস্থা। তবে মুখ ফুটে বলার সাহসটুকুও নেই। কারণ এখনো যেটুকু বেঁচে থাকার সম্বল রয়েছে তা হারালে যে, পথে বসা ছাড়া তাদের সামনে আর উপায় থাকবে না। 
আমারো একসময় খাতাটা দেখতে মন চাইলো। হাতে নিয়ে দেখলাম প্রচুর বাকি। আমি তখনও বুঝি নাই পুরো ব্যাপারটা। বললাম ভাড়া থেকে কেটে নেয় বুঝি? 
তখন দোকানদারের মুখটা মলিন হয়ে গেলো। এখনও চোখে ভাসছে সেই মুখটা। বললো আপা বাড়িওয়ালা কি করবো বলেন। কিছু হলে গালিগালাজ করে। ভাড়াতো ১-২ হাজার টাকা। কিন্তু বাকী পড়ে আছে ২০-৩০ হাজার টাকা। টাকাও দেয় না। বরং উল্টা এসে গালিগালাজ করে।
ততক্ষণে আমি বুঝলাম ছোট ছেলেটার ভয়ের কারণটা আসলে কি। তখন ক্লাস এইটের আবু ইসহাকের জোঁক গল্পটার কথা মনে পড়ে গেলো। কেমন করে গরীবকে চুষে খাচ্ছে এই দেখানো বড়লোকগুলো।
ওদের জন্য কিছুই করতে পারবো না, সেটা জানি। কিন্তু এসব ব্যাপার চোখে পড়লে বেশ কিছুদিন আর শান্তি লাগে না। শুধু মনে হয় এই শোষিত মানুষগুলোর ঝিমিয়ে-পড়া রক্ত যদি জেগে উঠে, গা ঝাড়া দিয়ে যদি বলতো যা থাকুক কপালে রক্ত চুষে খাচ্ছে, হজম করতে দেব না। তাহলে এমনটা ঘটতো না। কিন্তু এরা তা পারবে না। কারণ এদের রক্ত ঝিমিয়ে গেছে। এরা এই অপরাধগুলোকে বাস্তবতা এবং নিরর্ধারিত ভেবে নিয়েছে।
এই শোষিতরা না জেগে উঠলে শোষণকারীরা কিছুতেই বিলুপ্ত হবে না।

আরও সংবাদ

বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop