মুক্তকথাহত্যার দায় কার!

সময় সংবাদ

fb tw
ভাবুন তো, আপনাকে কয়েকজন ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলতে চাচ্ছে। একমাত্র স্ত্রী ঘাতকদের কাছ থেকে আপনাকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। আশেপাশের কেউ আপনাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসলো না। আর আপনিও নিরুপায়। সবশেষ আপনাকে কুপিয়ে আহত করে গেল সন্ত্রাসীরা। এরপর আপনি ধীরে ধীরে নিস্তেজ হতে লাগলেন। শরীরের রক্ত ঝরছে। রঞ্জিত হয়েছে পথ। আপনাকে কয়েক কিলোমিটার দূরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। স্বজনদের আহাজারি আর চিকিৎসকদের শত চেষ্টাও আপনাকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারছে না। মৃত্যু নিশ্চিত জেনে উন্নত চিকিৎসার জন্য আপনাকে অ্যাম্বুলেন্সে নেয়া হচ্ছে শত কিলোমিটার দূরের একটি হাসপাতালে। পথে আপনার জীবন তখন মৃত্যুর দ্বারে। সে হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় আপনি পৃথিবী ছাড়লেন। 
আপনার এই মৃত্যু অপ্রত্যাশিত। স্বজনদের কান্না আহাজারি, ব্যর্থ আগলে রাখা। সবকিছু ছেড়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। সবশেষে আপনার স্ত্রী ও পরিবারের অন্য স্বজনদের স্বপ্নেরও মৃত্যু হল। 
এবার বলুন এসবের জন্য কে দায়ী? আপনি, আপনার স্ত্রী, স্বজন, রাষ্ট্র ও সমাজ, নাকি পাশে দাঁড়িয়ে থেকেও আপনাকে যারা রক্ষা করতে আসেনি তারা? 
বরগুনায় স্ত্রীর সামনেই চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে রিফাত শরীফকে। আমরা বিশ্বজিৎ ও নুসরাতের মতো হত্যাকাণ্ড খবরে দেখেছি। বুধবার (২৬ জুন) বরগুনার ঘটনাটির বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের তথ্যের দিকে তাকালে দেখবেন প্রকাশ্যে একটি নৃশংস হত্যা। মনে হয়তো প্রশ্ন জাগবে নাগরিক হিসেবে আমরা কতটা সুরক্ষিত। 
একজন স্ত্রী তার স্বামীকে বারবার রক্ষার চেষ্টা করেও ঘাতকদের ধারালো অস্ত্রের হাত থেকে বাঁচাতে পারেনি। বলতে গেলে সদ্যবিবাহিত রিফাতের স্ত্রী হয়তো নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারবেন না। স্বামীর কথা মনে হলেই চোখের সামনে ভাসবে ঘাতকদের ধারালো অস্ত্রের আঘাত। এরপর চিরকালের বিদায়। হাজারো স্বপ্নের স্মৃতি ভরা চোখের কোনে হঠাৎ হারিয়ে ফেলা দুশ্চিন্তার ছাপ দুমড়ে মুচড়ে ভেতরটাকে ক্ষতবিক্ষত করবে।
ফিরবে না রিফাত, সমস্ত ভালোবাসার অপূর্ণতা রয়ে যাবে। মা-বাবার আদরের রিফাত ছুটে আসবে না। তাঁরা হয়তো সন্তানের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বিচার চাইবেন। আর আমরাও পারব না রিফাতকে তার স্ত্রী কিংবা মায়ের বুকে ফিরিয়ে দিতে।
কোন অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটলে তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরব হয়। খবরের কাগজ কিংবা টেলিভিশন খবর প্রচার করলে সে দিকে নজর দেয় সবাই। কিছুদিন পর ওই ঘটনা ধামাচাপা পড়ে। আসে নতুন ঘটনা তা নিয়ে আবার ব্যস্ত হয় সবাই। তবে কি কারণে একের পর এক এসব ঘটনা ঘটছে তা নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ কিংবা কার্যকরী পদক্ষেপ মূলত অধরাই থাকে।
বরগুনায় রিফাত হত্যায় সে হত্যাকারীদের যদি সহানুভূতি থাকতো তাহলে হয়তো এ ধরনের ঘটনা ঘটতো না। পাঠ্যবইয়ে কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আমাদের অনেকটাই পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি কিংবা শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়। তবে বাস্তব জীবনে তার কতটুকু প্রয়োগ ঘটে তা কখনো দেখা হয় না। লেখাপড়া করতে না পেরে মাধ্যমিকে যে শিশুটি ঝরে পড়ে, তারা শ্রদ্ধাশীল বা সহানুভূতি হওয়ার যথাযথ শিক্ষাটুকু পায় না। 
সহানুভূতি কিংবা শ্রদ্ধাশীলতা সবচেয়ে বেশি আসে পরিবার থেকে। এজন্য বড় ভূমিকা থাকে বাবা-মায়ের। অনেক সময় পরিবার সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ। আবার বাবা-মা না থাকায় পরিবারের স্নেহবঞ্চিতরা ধীরে ধীরে বখাটে হয়ে ওঠে। 
ছোটবেলার যে শিশুটি বিরূপ পরিবেশে বড় হয়, সে তার মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলে। জড়িয়ে পড়ে অপরাধ কিংবা নেশার জগতে। ছোট ছোট অপরাধ করে এক সময় জঘন্য কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শিরোনাম হয়, ঘটনা টপ অফ দা টাউন। অনেক সময়ে এরা আবার বড় বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের স্বার্থ হাসিলে তাদের ছত্রছায়ায় থাকে। রিফাত হত্যাকারীরাও হয়তো তেমনি।
অপরদিকে পেশীশক্তি ব্যবহারকারীদের কাছে প্রাচীন কাল থেকেই নিপীড়িত হয়ে আসছে দুর্বলেরা। যাদের অর্থবিত্ত আছে তাদের মধ্যে অনেকে আবার সামান্য স্বার্থ হাসিলে কণ্ঠরোধ করতে দ্বিধা করে না। এসব নিম্নশ্রেণীতেও দেখা যায়। প্রভাবশালী বা ক্ষমতাধর যে শুধু অর্থবৃত্তে হয় তা কিন্তু নয়। পাড়া মহল্লায় যার দল ভারী সে ওই এলাকার শক্তিশালী। তাকে মনে মনে অনেকেই ভয় করে চলে। কথা বলতেও সাহস পায় না।
একের পর এক নৃশংস হত্যার ঘটনা আমাদের মনকে নাড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বজিৎ হত্যা কিংবা নুসরাত হত্যার মত ঘটনা মানুষকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয় বড় বড় হত্যার ঘটনা আইনের পাশ কাটিয়ে খুনিরা পার পেয়ে যায়। উল্টো ভুক্তভোগীরা বিচার না পেয়ে নিরুপায় হয়ে থেমে যেতে বাধ্য হন। এ কারণে আজ প্রতিবাদ করতে মানুষ ভয় পান।  তাদের ভাবনা প্রতিবাদ করলে হয়তো গায়ে এসে পড়বে। আর এর প্রমাণ পাওয়া যায় বরগুনার রিফাত হত্যার মাঝে। ঘাতকরা অস্ত্র নিয়ে রিফাতকে আঘাত করতে থাকলেও আশেপাশে কাউকে এগিয়ে আসেতে দেখা যায়নি। 
এর সমাধান কি? একের পর এক এসব ঘটনা ঘটতেই থাকবে? 
আমার মনে হয় রাষ্ট্রের যেমন দায়িত্ব আছে তেমনি দায়িত্ব আছে আমাদের সবার। পথে দাঁড়িয়ে সবাই একত্রে প্রতিবাদ করলে হয়তো রিফাত বেঁচে যেতো। ঘাতকদেরও ধরে আইনের আওতায় আনা যেত।
তবে  সবচেয়ে বড় ভূমিকা হলো রাষ্ট্রের। সমাজকে রক্ষায় মানুষকে সহানুভূতি বা প্রকৃত শিক্ষা দেয়াটা যেমন জরুরি, তেমনি দ্রুত ঘাতকদের শাস্তির ব্যবস্থা করাও জরুরি। নয়তো আমাদের এ ধরনের ঘটনা একের পর এক দেখে যেতে হবে।
লেখক: এহসানুল হক শাওন
রিপোর্টার, সময় টেলিভিশন

আরও সংবাদ

বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop