ksrm

মুক্তকথাআদিবাসীদের জীবনে দিনবদলের স্বপ্ন

সময় সংবাদ

fb tw
somoy
আজ ৯ আগস্ট, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। এই দিবসটি বিশ্বব্যাপী নানা বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে। ১৯৯৪ সালে ২৩ ডিসেম্বর  জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস International Day of the World's Indigenous Peoples বা আন্তর্জাতিক দিবসটি পালনে ৪৯/২১৪ বিধিমালায় স্বীকৃতি পায়। 
আর্ন্তজাতিক এই দিবসটি বিশ্বের ৯০টি দেশে ৩৭০ বিলিয়ন  আদিবাসী প্রতিবছর ৯ আগস্ট উদযাপন করে থাকেন। জাতিসংঘ ১৯৯৩ সালকে আদিবাসী বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করে। বিশ্বব্যাপী আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়, ভূমির অধিকার, অঞ্চল বা টেরিটরির অধিকার, প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার ও নাগরিক মর্যাদার স্বীকৃতি দাবীতে দিবসটি পালিত হয়। 
বাংলাদেশে ৪৫টির অধিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪০ লক্ষ আদিবাসী মানুষ এই দিবসটি পালন করে বর্ণিল শোভাযাত্রা এবং বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে।
পাহাড়ের বুক চিরে একদিন আদিবাসীরাও স্বপ্ন দেখেছিলেন বলিভিয়ার আদিবাসী প্রেসিডেন্ট ইভোমোরালেসের মতো তাদের জন্য নতুন একটি সংবিধান রচনা হবে। তারা তাদের জাতিসত্ত্বার আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি পাবে। আদিবাসী শিশুরা তাদের নিজস্ব মাতৃভাষায় পড়াশুনা করবে। তাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া ভূমিতে তারা সবুজ ফসল ফলাবে। 
আদিবাসীদের সেই স্বপ্ন কি বুড়িগঙ্গা নদীর মতো মরে গেছে? না মরেনি। স্বপ্নই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। তাদের স্বপ্ন এই ধরিত্রীর বুকে মর্যাদার সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার। তারাও দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।
পাহাড়ী জনপদ আর যেন রক্তাক্ত না হয়।
আমরা যেন পাহাড়কে আর বৃষ্টির মতো কাঁদতে না দেই।
পাহাড়ে ধর্ষিতা বোনের আর্তচিৎকার যেন আমরা আর না শুনি।
আদিবাসীরাও একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর ডাকে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিলেন দেশ মাতৃকার জন্য। স্বাধীনতা স্বার্বভৌমত্বের প্রতীক এই লাল সবুজের পতাকায় আদিবাসী গারো, হাজং, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, রাখাইন, সাঁওতাল, ওঁড়াও, কোচ, বর্মণদের রক্ত মিশে আছে ।
ভূমি আদিবাসীদের জীবনের প্রতিচ্ছবি। সাহস ও সংগ্রামের অনু্প্রেরণা। এই ভূমির উপর দাঁড়িয়েই তারা আকাশ দেখে, বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়। ভূমিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে তাদের সংস্কৃতি। জীবন ও জীবিকা‌। আদিবাসীদের নিজভূমে পরবাসী হওয়ার গল্প মিথ্যে নয়। ভূমি নেই তো তাদের জীবনের ছন্দ নেই। অনূভুতি নেই আবেগ নেই।
আদিবাসীদের ভূমি যেন আর কেউ পাকিস্তানী হায়েনাদের মতো দখল করতে না পারে তার দায়িত্ব এই রাষ্ট্রকেই নিতে হবে । আদিবাসীরা যেন আর  ঠিকানাবিহীন উদ্বাস্তু জীবনে ফিরে না যায়। তারা যেন ভূমি হারিয়ে আর দেশান্তর না হয়। তাদের শাশ্বত সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য যেন অমলিন থাকে।
স্বাধীনতার সাতচল্লিশ বছর পরও এই রাষ্ট্র আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে পারেনি। তবুও আদিবাসীরা রাষ্ট্রের প্রতি তাদের যথাযথ আনুগত্য এবং সম্মান প্রদর্শন করে। আদিবাসীরা কখনো রাষ্ট্রবিরোধী নয়। তারা এই রাষ্ট্রকে ভালবাসে। তারা এদেশের ফুল,পাখি,নদী,অরণ্য,ভূমিকে ভালবাসে।
আমরা চাই বঙ্গবন্ধুর মতো মহান আপোষহীন নেতা। মার্টিন লুথার কিং অথবা সেই দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট নেলসন মেন্ডেলার মতো আত্মপ্রত্যয়ী নেতা। যে তাদের উত্তরসূরিদের জন্য স্বপ্নের নতুন বীজ বুনে যাবে। 
পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বন্ধ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে ২ ডিসেম্বর শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। শান্তিচুক্তির দুই দশক পরেও তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন প্রশ্নবিদ্ধ। শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের পথে আজ নীল নকশায় কাঁটাতারের বেড়া। এদেশের আদিবাসীরা কী পারবে এই কাঁটাতারের বেড়া ভেদ করে নতুন ভোরের সূর্যোদয় দেখতে ?
মানব সভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় মানুষ তার মৌলিক অধিকারের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছে, লড়াই করেছে সে তার বেঁচে থাকার প্রতিটি ক্ষেত্রে। যতদিন পর্যন্ত মানুষ তার মৌলিক অধিকার ফিরে না পাবে ততদিন পর্যন্ত এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। আদিবাসীদের জীবন সংগ্রাম হলো শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে। অসাম্য, অন্যায় এবং অসংগতির বিরুদ্ধে। হত্যা, ধর্ষণ, ভূমিদখল নিপীড়ন, সাম্প্রদায়িকতা এবং বিচারহীনতার বিরুদ্ধে। 
আমরা অসাম্প্রদায়িক চেতনার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখি যেখানে মূলধারার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাথে পিছিয়ে পড়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীর একটি বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির মেলবন্ধন অক্ষুন্ন থাকবে। আমরা মনে করি বর্তমান সরকার আদিবাসীবান্ধব সরকার। এই সরকার আদিবাসীদের প্রতি অনেক বেশি যত্নশীল, আন্তরিক এবং সংবেদনশীল। 
বিচ্ছিন্ন কিংবা বিক্ষিপ্তভাবে কোন জাতি তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে না। সে জাতি হোক না সংখ্যায় বৃহত্তম কিংবা ক্ষুদ্রতম। ঐক্যবদ্ধ শক্তির সামনে দাঁড়াতে না পেরে অনেক বড় বড় জাতির ইতিহাস পাল্টে গেছে। কালের আবর্তে হারিয়ে গেছে তাদের একসময়কার প্রভাবশালী সংস্কৃতি। আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিও আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। বিশেষভাবে সংখ্যায় যারা অতি নগণ্য যেমন হাজং, কোচ, ডালু বানাই, হদি,বর্মণ, পাত্র, রাজবংশী, খুমি, চাক, খিয়াং ইত্যাদি জনগোষ্ঠী অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর চেয়ে প্রান্তিক থেকে অধিকতর প্রান্তিক। তাদের মধ্যে ডালু, হদি, বর্মণরা এখন আর তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলতে পারে না। একটি জাতির ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে সে জাতির সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়া । সে জাতির পরিচয় হারিয়ে যাওয়া । 
আদিবাসী শিশুরা যেন তাদের মায়ের ভাষায় পড়াশোনা করার সুযোগ পায়। তারা যেন তাদের মায়ের ভাষায় কবিতা লিখতে পারে গান গাইতে পারে। এই সুযোগটি রাষ্ট্রকেই করে দিতে হবে।
আদিবাসীদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক জীবনধারাও বিভিন্ন সময় হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী তাদের উপর বিভিন্ন সময় নানারকম অত্যাচার, নিপীড়ন, যৌনসন্ত্রাস, অগ্নিসংযোগ, হত্যা চালিয়েছে। 
অধিকার আদায়ের জন্য আদিবাসীরা রাস্তায় নামে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। যখন পাহাড়ে কিংবা সমতলে কোন নারী ধর্ষণের শিকার হয় তখন তারা ধর্ষণকারীকে দ্রুত গ্রেফতারের দাবিতে মানববন্ধন করে যেন প্রশাসন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়। কেউ হত্যার শিকার হলে বিচারের দাবিতে বিভিন্ন সময় দেখা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের আদিবাসীরা শিক্ষার্থীরা অপরাজেয় বাংলার সামনে কিংবা রাজু ভাস্কর্যের সামনে ব্যানার এবং ফেস্টুন হাতে মানববন্ধন করে। শ্লোগানে মুখরিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর। বিচারের দাবিতে কিংবা ন্যায়বিচার পাওয়ার দাবিতে মানববন্ধন করার অধিকার বাংলাদেশের যে কোন নাগরিকের রয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের সুরক্ষা দেয়া এবং একজন নাগরিকের ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকারকে সুনিশ্চিত করা ।
আদিবাসীদের উপর সকল প্রকার বৈষম্য এবং সহিংসতা বন্ধ করতে রাষ্ট্রকেই ভূমিকা রাখতে হবে। বহু ভাষা বহু জাতি বহু সংস্কৃতির এই দেশ যেন সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিশ্বের বুকে মর্যাদার সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারে এই হোক আজকের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে আমাদের প্রত্যাশা ।
আমরা আদিবাসীদের জীবনে দিনবদলের স্বপ্ন রচনা করতে চাই একসাথে হাতে হাত রেখে।
 
লেখক: সুজন হাজং, গীতিকার

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। সময় সংবাদের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতে পারে। লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় সময় সংবাদ নেবে না।

আরও সংবাদ

বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
ভাইরাল
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
Latest News
আপনিও লিখুন
ছবি ভিডিও টিভি
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop