মুক্তকথাপঁচাত্তরের প্রতিরোধ যোদ্ধা অসিত সরকার সজল

সময় সংবাদ

fb tw
somoy
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যিনি বঙ্গবন্ধুর নাম সগৌরবে উচ্চারণ করেছিলেন, তিনি অসিত সরকার সজল। তিনি একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধা এবং পঁচাত্তরের প্রতিরোধ যোদ্ধা। 
অসিত সরকার সজল বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের অগ্নিঝরা ভাষণ শুনে উজ্জীবিত হয়ে একাত্তরে অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। আবার বঙ্গবন্ধু হত্যার সশস্ত্র প্রতিবাদ করতে গিয়ে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ফাঁসির আসামী হয়ে অমানবিক নির্যাতন এবং দুঃসহ যন্ত্রণা নিরবে সয়েছেন জীবনের ১৪টি বছর।
অসিত সরকার সজলের জন্ম ১৯৫৩ সালে ৩০ ডিসেম্বর নেত্রকোনা জেলা শহরের এক সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারে। তিনি আইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছবি-১: মুক্তিযোদ্ধা অসিত সরকার সজল
 
নেত্রকোনার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াকালীন তিনি ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তখন দেশের চরম ক্রান্তিকাল। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের হাতে প্রথম গ্রেপ্তার হন তিনি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রচারণা কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন । 
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা বাহিনীতে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেন অসিত সরকার। তখন তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল দেশমাতৃকাকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করা। 
১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর জেষ্ঠ পুত্র শহীদ শেখ কামাল সারাদেশে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বেগবান করার জন্য স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করেন। এসময় তিনি অসিত সরকার সজলকে নেত্রকোনা জেলার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেন। 
১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট জাতির জনককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর অসিত সরকার সজল এবং আওয়ামী লীগ নেতা মুকুল বোস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল থেকে সামরিক বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হন এবং অমানবিক নির্যাতনের পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় ।
সে বছরই অক্টোবরে অসিত সরকার সজল তার নেত্রকোনার বৈশাখী গার্ডেন বাসভবন থেকে আবার গ্রেফতার হন এবং অমানবিক নির্যাতন করার পর তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা এনে জেলে পাঠানো হয়। পরে জামিনে মুক্তি পান তিনি। 
কারামুক্ত হয়ে নেত্রকোনা থেকে ঢাকায় গিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হন অসিত সরকার সজল। ১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন খান ও খালেদ মোশাররফের মা এবং অন্যান্য নেতারাসহ অসিত সরকার সজল সর্বপ্রথম মৌন মিছিল করে  বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়িতে গিয়ে শত বাধা পেরিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। সেদিনই বিকেল ৩ টায় মতিয়া চৌধুরী ও মুকুল বোসের নেতৃত্বে সামরিক আইন ভঙ্গ করে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলে অংশ নেন অসিত সরকার। তোপখানা রোডে যান অসিত সরকার খুনি মোস্তাকের ছবি ভাঙচুর করেন এবং আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন। 
১১ নভেম্বর রাতে মানু মজুমদার, নিরঞ্জন সরকার বাচ্চু, ঝন্টু রায় ও অসিত সরকারসহ ১৫ জনের একটি দল গোপনে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে যান। ২ মাস পর অসিত সরকার সজল, মানু মজুমদার, নিরঞ্জন সরকার বাচ্চু, চন্দন বিশ্বাস, মোতাহার হোসেন মোল্লা ও জ্যোতিষ সরকার দুলাল সশস্ত্র হয়ে ঢাকায় আসেন এবং আওয়ামী নেতৃবৃন্দদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। 
বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ কর্মী বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল রহমানের সহযোগিতায় অসিত সরকার সজল, মানু মজুমদারসহ অন্যান্য সহযোদ্ধারা খুনি খন্দকার মোস্তাককে হত্যার মিশনে অংশ নেয়ার জন্য গোপন বৈঠকে বসেন। কিন্তু সেদিনই গোয়েন্দা পুলিশের হাতে অসিত সরকার সজল এবং মানু মজুমদার বজলুল রহমানের বাসায় গ্রেফতার হন এবং বজলুল রহমান জিগাতলা থেকে গ্রেফতার হন। তাদের ধানমন্ডি থানায় ১৭ দিন ধরে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। পরে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দিয়ে তাদের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। দেড়মাস পর নির্যাতনের ফলে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে অসিত সরকারকে কেন্দ্রীয় কারাগারের হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।
ছবি-২: অসিত সরকার সজলকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা প্রদানের জন্য নিয়ে যাওয়ার সময়
 
এর ৭ দিন পর অসিত সরকার সজল, মানু মজুমদার, বজলুল রহমানকে চোখে কালো কাপড় বেঁধে সামরিক গোয়েন্দা অধিদপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের উপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। তারপর আবার ১ মাস পর জেলখানায়। 
১৯৭৭ সালে গণভবনে ১নং সামরিক আদালত স্থাপন করা হয়। সেই সামরিক আদালতে অসিত সরকার সজল, মানু মজুমদার ও বজলুল রহমানকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। কিন্তু বয়স বিবেচনায় তাদেরকে সরাসরি মৃত্যুদণ্ড প্রদান না করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। শুরু হয় দীর্ঘ কারাজীবন।
একদিন জননেত্রী শেখ হাসিনা অসিত সরকার সজল, মানু মজুমদার, বজলুল রহমান ও মোহাম্মদ নাসিমকে দেখতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যান এবং সেখানে তিনি তাদের মুক্তির ব্যাপারে সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করার আশ্বাস দেন। এটি ছিল তাদের জীবনে চরম প্রাপ্তি।  সেই ধারাবাহিকতায় মমতাময়ী জননেত্রী শেখ হাসিনার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় দীর্ঘ ১০ বছর কারাভোগের পর তারা মুক্তি লাভ করেন । 
কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার কিছুদিন পর ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ওবায়দুল কাদের, ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, অসিত সরকার সজল, মানু মজুমদার আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ লাভ করেন ।
১৯৮৫ সালে নেত্রকোনা জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে আওয়ামী লীগ নেতা এডভোকেট ফজলুল রহমান খান তাকে প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব অর্পণ করেন। ২০১৮ সালে অসিত সরকার সজলকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত করা হয় এবং তার সহযোদ্ধা মানু মজুমদারকে নেত্রকোনা-১ দুর্গাপুর-কলমাকান্দা আসন থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। পরে মানু মজুমদার  সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
অসিত সরকার লোভ লালসার উর্ধ্বে থেকে সাদামাটা জীবন যাপন করছেন। বড় কোন প্রাপ্তির কথা জীবনে কখনো চিন্তা করেননি। নিরবে নিভৃতে পার করেছেন জীবনের অনেকটা সময়। তাঁর কাছে জীবনের প্রাপ্তি বলতে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশ।
একদিন অস্ত্র হাতে যে দেশ স্বাধীন করেছিলেন, সেই দেশমাতৃকার সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেয়াই অসিত সরকার সজলের জীবনের শেষ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। তিনি স্বপ্ন দেখেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে তাঁর চিরচেনা নেত্রকোনা পৌরসভাকে জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় এনে সেখানকার মানুষের পাশে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দাঁড়ানোর।
লেখক: সুজন হাজং, গীতিকার
 
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। সময় সংবাদের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতে পারে। লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় সময় সংবাদ নেবে না।

আরও সংবাদ

বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop