মুক্তকথামানুষ এতো অনুভূতিহীন কখন হলো?

সময় সংবাদ

fb tw
somoy
আমাদের কলোনি থেকে যাওয়া আসা করতে একটা শর্টকাট খুঁজে পেয়েছি। জমির মালিক এখন শুধু ভাড়া তুলতে আসে। তাই একসময়ের সাজানো গোছানো শরিফ কলোনি এখন ভাগাড়ের কাছাকাছি। আর, সে কারণেই বোধ হয় বেশী তাড়া থাকলে ওই শর্টকাটে পা বাড়াই ইদানীং। সেটাও খুব একটা পরিষ্কার, তা নয়। তো, গত সপ্তাহ থেকে দেখছি সেখানে একটা আসন-ঘর পড়ে আছে।
হিন্দু বাড়ীতে দু'বেলা ঠাকুর পূজা করতে একটা ঘরের মতো বানিয়ে সেখানে দেব-দেবতার মূর্তি, ছবি রাখে, সেটা হলো আসন ঘর। এটা লিখলাম, কারণ এটা চেনে না, জানে না এরকম লোকজন আমি দেখেছি। দেওয়ানজী পুকুর রাস্তার যেদিকে গেলে সিরাজুদ্দৌলা রোড যাওয়া যায়, সেখানে দু' তিনটা দোকান ছিলো, যারা এরকম আসন বানাতো। আমার দর্জি দোকান নিয়েছিলো ওখানে। বার্নিশের চমৎকার সুগন্ধ পেতাম ওদিকে গেলে। মিস্ত্রিরা কাজ করতো, চেয়ারে বসে পান চিবুতো লম্বা দাড়িওয়ালা শ্বেতশুভ্র টুপি-পাঞ্জাবী-পায়জামা পরা মালিক। এখন ভেঙে ফেলেছে দোকানগুলো, বড় বিল্ডিং বানাবে বলে। এসব বলার মর্মার্থ হলো, আসন-ঘর কী জিনিস সেটা জানতে হিন্দু পরিবারে জন্মাতে হয় না।
যা হোক। সেই শর্টকাট রাস্তায় গত সপ্তাহ থেকে পড়ে আছে ছোটখাটো একটা আসন। একদিন কতো যত্ন করে, কতো সম্মান করে এটা রাখা থাকতো বড় কর্তার শোবার ঘরে। দুই বেলা ধূপ ধুনো জ্বলতো এটার সামনে। লম্বা মোমবাতিদান বা ট্রে করে মোম জ্বলতো। প্রদীপের সলতে উস্কে দেওয়ার কাঠিটা গুঁজে রাখা হতো আসনের ছোট্ট ছোট্ট গুম্বুজের খাঁজে।
কোনো কোনো ফ্ল্যাটে দেখা যায়, ওরা শুধু আসন রাখার জন্য একটা আলাদা জায়গা বানিয়েছে। এটা প্রথম দেখেছিলাম নন্দনকানন দুই নম্বর গলির এতিমখানার মোড় ঘুরে ওখানে কোনো বিল্ডিংয়ে কারো বাসায়। এই আসনটাও হয়তো ওরকম কোথাও বসানো হয়েছিলো! নিয়মিত পূজা করতেন বাড়ী গিন্নিরা বা বয়ঃবৃদ্ধ কেউ।
আবার, লক্ষ্মীপূজায় ব্রাহ্মণমশাই দুলে দুলে মন্ত্রপাঠ করতেন আল্পনা আঁকা পিঁড়ির উপর রাখা মা-লক্ষ্মীর মূর্তির সামনে বসে। পিঁড়ি পাতা ছিলো আসনের পাশে। ঘরের দুয়ার থেকে আসন পর্যন্ত সুচারু আল্পনা সহকারে আঁকা হতো মা লক্ষ্মীর সুকোমল পদযুগলের ছাপ। বাড়ীর কেউ আসন-ঘরের ছাদে রাখা লক্ষ্মীর পাঁচালীটা নিয়ে দ্বিগুণ স্বরে পড়তে শুরু করতো।
আরেকদিন হয়তো সরস্বতীপূজা হতো বাড়ীর বাচ্চাকাচ্চাদের বইপত্র, খাতা-কলম সাথে নিয়ে। আসনের সামনেটা ভরে যেতো খাতাপত্রে। যে যেটাতে দুর্বল, সেই বিষয়ের বই থাকতো সবার উপর, যাতে দেবীর কৃপাদৃষ্টি সবার আগে সেই বইয়ে পড়ে। পূজা শেষে মা-সরস্বতীর পায়ের ধুলা-ধন্য ফুল-পাতা স্থান পেতো বইখাতার পাতায় পাতায়।
ব্রতের ভাত রান্না করা পাতিলটাও রাখা হতো সেই আসন-ঘরের পাশেই। সাথে থাকতো বাংলাকলা আর নারকেল কুঁড়িয়ে বানানো পুর ভর্তি দুটা বড় বড় বাটি। শুকনাকাঠি পুরুতঠাকুর পূজা শেষ করে যেতেন। পরদিন শুরু হতো জনে জনে ব্রতের ভাত খাওয়া। বাড়ির সবাই তো বটেই, যে অতিথিই আসুক, তাকে দেওয়া হতো খেতে।
হতো সত্যনারায়ণ পূজা, শনি পূজা..... আরো কতো কতো ব্রত... পূজা.... বাচ্চাদের নামকরণ বা অন্নপ্রাশন অনুষ্ঠানগুলোও হতো ওখানেই।
আসনের ভিতর যত্ন করে রাখা ছিলো ঠাকুরদেবতার ছোট বড় মূর্তি, ছবি। আসনের উপরে বক্স করে রাখা ছিলো মূর্তির রঙবেরঙের জামা। সেখানে আরো ছিলো পূজায় ব্যবহার্য তৈজসপত্র। মোমের নরম আলোয় কাঁসার ঘটিবাটিগুলো সোনার মতো ঝকঝক করতো। দুবেলা কাঁসর ঘণ্টা বাজতো, ধূপধুনো সুগন্ধি ছড়তো। মোমবাতির আলোর ছটায় চমকাতো বার্নিশ করা কাঠের ছোটখাটো আসনটা। সেখানেই এক কোণায় রাখা ছিলো ছোট্ট একটা বোতল ভর্তি পবিত্র গঙ্গাজল।
আজ এই আসন ঘর পুরানো হয়ে গেছে, বা হয়তো এরচেয়ে একটা বড় আকারের একটা কেনা হয়েছে। তাই এই জিনিস আজকে বাতিল। সে এমন ভাবে বাতিল হয়েছে, তাকে ফেলে দেওয়া হয়েছে বিল্ডিংয়ের নীচে জমে থাকা যতো ময়লায় ভিতর। যেদিন প্রথম দেখেছি, সেদিন সে বড় অবহেলায় আলগোছে পড়ে ছিলো যাওয়া আসার পথে। দু'দিন পর দেখি, কেউ সেটা সরিয়ে একপাশে বসিয়ে রেখেছে। কিন্তু আসন ঘরটার মুকুট ছিলো একটা, বৌয়ের মুকুটের মতো, পড়ে থেকে থেকে ভেঙে গেছে, সেটা এখনো আগের জায়গাতেই আছে।
কী আশ্চর্য! একদিন এটা ঘিরেই সব ছিলো। এটা ছিলো বাসার পবিত্রতম বস্তু, পবিত্রতম জায়গা। আজ এটার রিপ্লেইসমেন্ট এসে গেছে, তাই এটার জায়গা হলো ভাগাড়ে। যাদের বাসায় ছিলো এটা, তারা ফেলে দিতে একটুও ভাবলো না? "আমাদের ঠাকুরপূজার আসনটা আমরা কিন্তু একটা ময়লাভর্তি জায়গায় ফেলে দিচ্ছি" - এ কথা একবারও মনে হলো না ফেলার সময়? মানুষ এতো অনুভূতিহীন কখন হলো?
ওটার আশেপাশে কী কী পড়ে আছে, সেটা কহতব্য নয়। কাদা জমে থিকথিক হয়ে থাকলে, মানা যেতো। পশুপাখির বর্জ্য হলেও মেনে নিতাম। দুঃখের, হতাশার, বিবমিষার উদ্রেক ঘটার কারণ, সেখানে জমে আছে মানুষের তৈরি বর্জ্য। এর উৎপত্তি, প্রকারভেদ, উদাহরণ এসব বিশদ বলে লেখাটা পূঁতিগন্ধময় করতে চাই না। 
এভাবে বলার কারণ, মানুষ মানুষ হয়ে নিজের বর্জ্য নিজে পরিষ্কার করে না। রান্নাঘরে ঝুড়ির, ওয়াশরুমের, সিটি কর্পোরেশনের দেওয়া নীল রঙের ডাস্টবিনের - যতো রকম ময়লা থাকতে পারে জাস্ট ফেলে দেয়, সেটার কোনো গতি করে না। এখন এই সভ্যতার জয়যাত্রায় সেটা সম্ভবও না। এখন এ কাজ করার নির্দিষ্ট লোক আছে। মানলাম। কিন্তু যেটা যেখানে ফেলার সেখানে ফেললেই হয়। মানবজাতির কয়জন কাজটা সঠিক ভাবে সম্পাদন করে? নয়তো, আজকে কেন মহাসাগরগুলোও পরিষ্কার করতে হচ্ছে? 
রাস্তায় রাস্তায় ঘোরা বিড়ালও যেখানে হাগু করে, সেখানেই মাটি খুঁড়ে চাপা দিয়ে দেয়। বহু সম্মান করে, যত্ন করে, সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা একটা জিনিস শুধুমাত্র আর পছন্দ হচ্ছে না বলে এতো সহজে ভাগাড়ে ফেলে দেওয়া - মানুষই পারে এ কাজ করতে।
দুনিয়া আসলে বড় অনিশ্চিত। এক মুহুর্ত পরে কী ঘটবে কেউ বলতে পারে না। রাজা-মহারাজার মতো গর্জিয়াস জীবন একদম পাল্টে গিয়ে ভিখারির অধম জীবন হতে একটা লহমাই যথেষ্ট। কী ছিলো, কী হলো বুঝতে ওঠার আগেই সব সাঙ্গ হয়ে যায়। ওলট-পালট হয়ে যায় সব হিসাবনিকাশ। এই পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন-প্রাণ প্রাণীরও একদিন মৃত্যু অনিবার্য। সেখানে মানুষ কোন ছাড়।
তাও আমরা, মানুষরাই হিংসা করি, মারামারি কাটাকাটিতে ব্যস্ত থাকি। যখন শরীর বাতিল হয়ে যাবে এভাবে, তখন কিছুই সাথে করে নিতে পারবো না - এটা আমরা মনে রাখিনা।
লেখক: হোমশিখা দত্ত, এনজিও কর্মী
 
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। সময় সংবাদের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতে পারে। লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় সময় সংবাদ নেবে না।

আরও সংবাদ

বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop