মুক্তকথাযাঁকে আজীবন শ্রদ্ধা করা যায়...

জাহিদুল ইসলাম রিফাত

fb tw
somoy
হঠাৎ ফেসবুকে একটা নোটিফিকেশ আসলো। চেক করে দেখি আমার খুব প্রিয় শিক্ষক আজ অবসর গেছেন।
মেসেজটা দেখতে দেখতেই একটা ফোন এলো। ধরতেই অন্য প্রান্ত থেকে বললো, দোস্ত, স্যার অবসর গেছে তুই দেখেছিস? আমি বললাম হুম, তাই দেখেছিলাম। সে আবার বললো, তোর খুব প্রিয় স্যার ছিলো। আমি বললাম, শুধু কি আমার? সে বললো, নারে, আমাদের সবারই।
এবার সে আমাকে বললো, পারলে প্রিয় শিক্ষক নিয়ে কিছু লিখে ফেল। কথাটা শুনেই কেমন জানি খুশি হয়ে গেলাম। যে স্নেহ, শাসন আর ভালোবাসায় বটবৃক্ষের ছায়া পেয়েছিলাম, তা সবাইকে জানানো উচিৎ।
ছোটবেলা থেকে পড়াশুনায় খুব ফাঁকিবাজ ছিলাম। পড়তে চাইতাম না। স্যারকে দেখলেই মেজাজ খারাপ হয়ে যেতো। কখনোই ভাবিনি, কেউ আমার প্রিয় শিক্ষক হতে পারেন।
কিন্তু স্যারের সংস্পর্শে আসার পর বুঝতে পারলাম, এমন একজন শিক্ষক পেয়ে গেছি, যাঁকে সমস্ত জীবন শ্রদ্ধা করা যায়। যাঁর আদর্শে জীবন পরিচালনা করা যায়; যাঁর স্নেহের স্পর্শে আগামী দিনে ভালো কিছু করার প্রেরণা পাওয়া যায়।
মাত্র দুই বছর সৌভাগ্য হয়েছিল স্যারের সান্নিধ্য গ্রহণের। ভালো কথা, এখনো সেই প্রিয় মানুষটির নামই বলা হলো না, যার কথা লিখেই যাচ্ছি। ওনার নাম মিজান স্যার।
আমি খুবই সৌভাগ্যবান। কারণ, আমার শিক্ষা জীবনে বেশ কিছু ভালো শিক্ষক পেয়েছিলাম। তাদের সকলের প্রতিই আমি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু কেউ যদি বলে মাত্র একজন শিক্ষককে বাছাই করতে তাহলে সেটি আসলেই কঠিন কাজ।
তবে আমার জীবনে যে সকল শিক্ষকের আদর্শ ও শিক্ষা খুব গভীরভাবে মনে ছাপ ফেলেছে তাদের মাঝে অন্যতম মিজান স্যার।
স্যারের বাড়ি যশোরের নওয়াপাড়ায়। ছিলেন ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক। আমি তখন নওয়াপাড়া মডেল স্কুলের নবম শ্রেণিতে পড়ি। আমার ছোটবেলা থেকেই ভীষণ গণিতভীতি। সেই ভীতি পূর্ণগ্রাসেই আছে এখনো।
গণিতের কেবল একজন দক্ষ শিক্ষকই নন, দারুণ গানও গান মিজান স্যার। এক সময় স্যারের সঙ্গে এক অদ্ভুত সখ্য গড়ে উঠল। এখন বুঝতে পারি, স্যারের ছিলো বহু গুণ। কখনো তিনি কঠোর শিক্ষক, কখনো স্নেহপূর্ণ পিতা আবার কখনো বন্ধু।
সবাই বলতো তুই এইবার পাস করবি না। কিন্তু স্যারের চেষ্টাতেই দিনে দিনে হিসাব বিজ্ঞানে ভালো হয়ে উঠলাম। স্যারের চেষ্টায় আমি এসএসসিতে পাস করেছি।
জীবনের ৩৩ বছর ৫ মাস ১১ দিন মানুষ গড়ার কাজে ব্যয় করেছেন মো: মিজানুর রহমান স্যার। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের সহকারী শিক্ষক হিসেবে নওয়াপাড়া মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন ১৯৮৬ সালের পহেলা মার্চ।
হিসাব বিজ্ঞানের শিক্ষকের কথা ভাবলেই অনেকের মাথায় আসে রাগী, হাতে বেত নিয়ে দাঁড়ানো একটা চরিত্রের। কিন্তু মিজান স্যার তেমনটা ছিলেন না। উনি ছিলেন ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি সর্বদা আন্তরিক। সবাইকে সাহায্য করতে উৎসাহী।
হিসাব বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে উনি আসলেই অতুলনীয়। একই সঙ্গে ছিলেন একজন সৎ চরিত্রের সহজ-সরল জীবনে বিশ্বাসী মানুষ; যাকে দেখে ছাত্র-ছাত্রীরা নীতিবান হতে উৎসাহী হতো।
ছাত্রদেরকে খুব সহজভাবে বুঝাতে পারার অসাধারণ ক্ষমতা ছিলো স্যারের। গণিতের মতো কঠিন বিষয়, যা অনেকের কাছে আতঙ্ক, এমন একটি বিষয়ও স্যার আমাদেরকে এতো উৎসাহ এবং সহজভাবে পড়িয়েছেন যে, সকল ছাত্র-ছাত্রীই তার ক্লাসে মুগ্ধ থাকতো।
স্যার শুধু গণিতে দক্ষ ছিল তা নয়, ছিলেন গানেরও শিক্ষক। অনেকেই তার কাছে নিয়মিত গান শিখতো।
আমার মনে আছে, পড়ার সময় স্যার বলতেন, এত নাম্বার পেজ খুলে এত নাম্বার অঙ্কটা করে দেখাও তো!! একবার আমার এক সহপাঠী স্যারকে প্রশ্ন করেছিল, স্যার আপনি কোন পেজে কোন অংক আছে তা মুখস্থ করলেন কিভাবে?
জবাবে স্যার হেসে বলেছিলেন, “বাবা, আমি অংক মুখস্থ করি নাই। তোদের পড়াতে পড়াতে দীর্ঘ ২৫ বছর বইয়ের কোথায় কী আছে তা এমনিতেই মুখস্থ হয়ে গেছে!”
স্যার কখনই তার ছাত্রদের তার কাছে প্রাইভেট পড়তে চাপ দিতেন না। দিবেনই বা কেন? উনি তো টাকার জন্য পড়াতেন না। নওয়াপাড়া মডেলে পড়ার সময় অনেক ছাত্র ছিল যারা বিভিন্ন শিক্ষককে নিয়ে বিভিন্ন কথা বলতো, তবে তাদের মাঝে কেউই কখনই মিজান স্যারকে নিয়ে কিছু বলার সাহস পায়নি। উনি এমন একজন শিক্ষক যিনি সকলের মন জয় করে নিতে পেরেছিলেন এমনিতেই।
মাঝে মাঝে দেখতাম এতো বয়স হওয়া সত্ত্বেও পুরনো একটা বাইসাইকেল নিয়ে স্কুলে আসতেন তিনি। যে সাইকেলটা এখনও স্যার অনেক যত্ন সহকারে রেখেছেন। বাইরে থেকে বাসায় ফিরে বাসার নিচে ঠিক বারান্দার পাশে একটা ছোট্ট ঘরের ভিতরে সেই সাইকেলটা রেখে দেন তিনি।
জানি না, স্যার এর কাছে আমার এই লেখাটি কখনো পৌঁছাবে কিনা।
স্যার, আজ আপনাকে একটা কথা বলতে চাই। আপনাকে শুধু আমি না, শামিম, মাসুম বিল্লাহ, নিজাম, সাজিদ, আরিফা আমরা সবাই সত্যি খুব ভালোবাসি। সামনাসামনি হয়তো কখনও বলতে পারিনি কথাটা। আজ এ লেখার মাধ্যমে হয়তো জানিয়ে দিলাম নিজের সে না বলা কথাটা।
আপনি যেখানেই থাকবেন, ভালো থাকবেন। সুস্থ থাকবেন। সে প্রত্যাশাই রইলো। আপনার দোয়া ভিখারি আমরা।

আরও সংবাদ

বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop