ksrm

মুক্তকথা‘ওর হাতের বাঁধনটা হালকা করে দাও যেন মাটিতে বসতে পারে’

সময় সংবাদ

fb tw
somoy
২০০৭ এর শুরুর দিকে যে লগী বৈঠার আন্দোলন শুরু হলো ঐদিন আমরা সবাই ক্যাম্পাসের ডাচের সামনে দাঁড়ানো। আমরা একটা মিছিল নিয়ে ২৩ নাম্বার গুলিস্থান পার্টি অফিসের দিকে যাবো। ওখানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি হঠাৎ দেখি কলাভবনের গেইট থেকে ছাত্রদলের ছেলেরা গুলি করতে করতে আসছে। আমরা তখন কিছু বুঝে ওঠার আগে ওরা বৃষ্টির মত গুলি বর্ষণ করে টিএসসি পর্যন্ত চলে আসছে।
তখন আমার একটা মোটরসাইকেল ছিল। ওদের গুলি বর্ষণে দিক না পেয়ে আমার মোটর বাইকটি রেখে আমরা টিএসসির ভিতরে চলে গেলাম। ওরা আমাদের চোখের সামনে আমার মোটর সাইকেলটি জ্বালিয়ে দিল। পরে টিএসসির পেছন দিক দিয়ে আমরা পরমাণু শক্তি কমিশন হয়ে বেরিয়ে যাই। এরই মধ্যে তারা আমাদের যারে পাইছে তারে মেরেছে। ওখান থেকে আমরা পার্টি অফিসে চলে গেলাম। সেখানেও লগী বৈঠার আন্দোলন চলতেছে। সেখানে শিবিরের ছেলেরা বৃষ্টির মতো ইট মারতেছে, গুলি করতেছে।
একদিন হঠাৎ করে ওয়ান ইলেভেন। মাননীয় নেত্রী তখন সুধা সধনে থাকতেন। ওখানে আমরা ছাত্রলীগের নেতারা নেত্রীর সাথে দেখা করলাম। নেত্রী বললেন যে, কি হচ্ছে বোঝা যাচ্ছে না? তোমরা সাবধানে থেক। আমরা নেত্রীর বাসা থেকে বের হয়ে আসলাম।
আমাকে ঢাবির দোয়েল চত্বরে নামিয়ে দেয় আমাদের কেন্দ্রীয় নেতারা। তখন আমি আমার হলে দিকে চলে গেলাম। হঠাৎ হলের সামনে থেকে দেখি আমাদের কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িটা আর্মি ঘিরে ফেলেছে। তখন আমার সাথে ছিল সূর্যসেন হল ছাত্রলীগের সভাপতি লাভলু মোল্লা শিশির আমি তখন শিশিরকে বললাম, চল। একসাথে যাই কি হয় না হয় দেখি। সে বলল, তুই যাইস না। আর্মি কিন্তু মারে। আমি বললাম, একসাথে আমরা আসলাম, না গেলে খারাপ দেখা যায় না। আমরা তো এ ক্যাম্পাসের ছাত্র। আমরা তো কোনো অন্যায় করি নাই, চল যাই।
এরপরে আমরা গেলাম। আমরা গিয়ে দাঁড়াতে আর্মির লোকেরা বলল আপনারা? ওখান থেকে আমাদের কেন্দ্রীয় নেতাদের একজন বলল, ওরে নামিয়ে দিছি আমরা। ওর হল এটা। তখন তারা বললেন যে, অসুবিধা নাই। আমরা তো এদেশের নাগরিক। এটা বলে ওরা ফোনে কার সাথে যেন আলাপ করেছিল। এরপর আমাদের নিয়ে গেল জিমনেশিয়ামের মধ্যে। আমার তখনও কনফিডেন্স ছিল যে, আমরা তো কোনো অন্যায় করিনি। তাছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈধ শিক্ষার্থী। জিমনেশিয়ামে ঢুকতেই ওরা আমাদের চোখ, হাত, পা বেঁধে ফেলল তখন আমার কাছে খুব আতঙ্ক মনে হলো। ওরা তখন বলেছিল যে, প্রথমে ডান পায়ে মারবা. তারপর বাম পায়ে মারবা। অতঃপর সব স্বীকার করলে ছেড়ে দিবা।
আমি বুঝি নাই তারা এসব কেন বলতেছিল? এরপর জিমনেশিয়ানের রাস্তা থেকে মাঠের গ্যালারি পর্যন্ত গেলাম, এরপর এমনভাবে আমাদের মারলো মনে হচ্ছে যেন আমরা কত বড় অন্যায় করে আসছি। টানা এক থেকে দেড় ঘণ্টা আমাদের অনবরত মারলো। কি কারণে মারতেছে তাও জানি না। একটু পর তারা আমাদের বলে যে, তোরা তো শেখ হাসিনার বাসা থেকে আসছিস। তিনি তোদেরকে কি বলে দিয়েছে? তিনি কাদেরকে মারতে তোদের নির্দেশ দিয়েছে? আর কার প্রতি কি কি ডিরেকশন দিয়েছে? তোদের দিয়ে তো তিনি সবকিছুই করান। তখন আমি বললাম যে, আমাদের সাথে তো নেত্রীর এধরনের কোনো কথা হয়নি।
আমার এ উত্তর শুনে আবার মারতে শুরু করলো। তখন তারা মারার সাথে সাথে আরেকটা জঘন্য কাজ করেছিল। সে সময় প্রচণ্ড শীতের মধ্যে তারা আমাদের গায়ে পানি ঢেলে দিল। ভেজা শরীরে এরপরেও মার বন্ধ করেনি। আমাদের পুরো শরীর দাগ হয়ে গেল।
রাত আড়াই থেকে তিনটার দিকে ওদের কে যেন এসে বলল এখানে জুয়েল কার নাম। আমি বললাম, আমার নাম। তখন তিনি বললেন, তোমাদের যে ধরলো তোমরা পরিচয় দিলা না। তোমরা তো ছাত্রলীগের নেতা। তখন আমি বললাম যে, আপনারা তো পরিচয় পাওয়ার পরেই মারছেন। তখন উনি বললেন আহারে ভাই! মিসটেক হয়ে গেছে, তোমাদের জন্য কি করতে পারি? তখন আমি বললাম, আমার হাতের বাঁধন একটু খুলে দেন। আমি মাটিতে একটু বসতে চাই। তখন তিনি কাকে যেন বললেন ওর হাতের বাঁধন টা খুলে হালকা করে দাও যেন মাটিতে বসতে পারে।
ক্ষত-বিক্ষত শরীর নিয়ে তখন শীতে কাঁপতেছি। আমার হাতের নখ তুলে ফেলল। রক্ত ঝড়তে থাকলো হাত থেকে। তারপরেও মার কিন্তু দেয়া বন্ধ করে নাই। কি অন্যায়ে এসব নির্যাতনের শিকার হচ্ছি তাও জানি না। তারপরে তারা বলল, ইউনিভার্সিটিতে আসলে তোরা আমাদের সালাম দেস না। আমি তখন এ কথাটা না ‍বুঝে তাদের ভাই বলে সম্বোধন করলাম। ভাই বলার পর তারা বলল, ভাই বললি কেন? তখন আমি স্যার বললাম। এটা বলার আবার মারল। কেন স্যার বললি? কি বলবো বুঝতেছিলাম না। এরপরে আবার প্রচণ্ড মার শুরু হলো।
আমার হাতের বাঁধন হালকা থাকায় আমি তখন চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টার করলাম। আর হালকাভাবে দেখলামও। দেখলাম আমার সামনে দুই-তিনজন লোক রাইফেল তাক করিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে একজন আমার হাতের রশি ধরা। আমি তখন ভরসা নিয়ে সৈনিককে জিজ্ঞেস করলাম, যে লোকটা এসে আমার নাম জিজ্ঞেস করে আমাদের খবর নিল, উনি কোথায়? সৈনিক লোকটা তখন হাসতে হাসতে বলে যে, বেটা! ‍বুঝলি নাতো! যে তোরে বাঁধন খুলে দিতে বলছে , উনি তোরে মেরে গেল। এ কথা শুনে আর কারো উপর যেন ভরসা করতে পারছিলাম না।
এরপরে তারা আমাকে ও রোটন ভাইকে আলাদা করে গ্যালারির ঐদিকে নিয়ে গেল। তখন ওরা বললো যে, আমরা যে বিষয়ে বলবো তোমরা সে বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিবি। আর যদি না দাও তাহলে তোমাদের ক্রসফায়ার দেব। তখন ওরা আমাদের নেত্রীর নামে অযৌক্তিক কথা বলতে থাকলো। তখন ওদের কথা শুনে বুঝলাম ওদের টার্গেট আমরা না, টার্গেট ছিল আমাদের নেত্রী। আমি বললাম, মাইরা ফেলেন। তারপরেও আমরা কোনো পেপারসে সাইন করতে পারবো না, স্বীকারোক্তিও দিব না।
একটা পর্যায়ে মনে হলো, এতো টর্চারের চেয়ে মরে যাওয়া মনে হয় ভালো হবে। এরপর আবার মার শুরু হলো পায়ের গোড়ালিতে, মাথার উপরে। আরো কিছু বাজে আচরণ আমাদের সাথে করলো, যেটা আসলে বলা সম্ভব না। আমরাও দৃঢ়চেতা ছিলাম। জীবন চলে যাবে। তারপরেও নেত্রীর প্রশ্নে আপোষ করবো না। আমরা বললাম, সবাই দেশটাকে যেরকম ভালোবাসে নেত্রী তার চেয়ে অনেক বেশি ভালোবাসে। তখন তারা বলল, শেখ হাসিনা কি চায় এদেশে?
আমি বললাম, এদেশটাকে ভালো করার জন্য, দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটাবার জন্য নেত্রী কাজ করেন। এটা শুনে ওরা বলল, না। উনার উদ্দেশ্য কি? এ কথা বলে ওরা নেত্রীর নামে যা তা বলল। এরপর আবার শুরু হলো আমাদের উপর অত্যাচার। এ টর্চার এতোটা বর্বর ছিল যে, মনে হলো আর বাঁচবো না।
তারপরে হঠাৎ করে কেউ সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বলল, উনারা যা চায় দিয়ে দেন। আমরা আপনাদের ছাড়ার ব্যবস্থা করবো। তখন আমাদের নীরবতা দেখে তিনি বললেন, চিনেন নাই আমাকে। আমি তো অমুক পত্রিকার সাংবাদিক। কিছুক্ষণ পরে শাহবাগ থানার ওসি আসলেন। উনি বললেন, ভাই আসলে আমরা তো কিছুই করতে পারতেছি না। আমরা আপনাদের নিয়ে যাবো। আরেকটু ধৈর্য্য ধরতে হবে। এরপরে উনি গেলে আমাদের আবার মারলো। সারা শরীর রক্তাক্ত তখন। এরপরে তারা বলল, তোরা তো স্বীকার করবি না। ক্রসফায়ার নাকি পুলিশ কোনটা চয়েজ কর? আমি বললাম যে, পুলিশে দিয়ে দেন। পরে পুলিশের কাছে গেলে তোমাদের ভালো লাগে এ বলে আবার মাইর দিল। এরপর পুলিশ আমাদেরকে শাহবাগ থানায় নিয়ে যায়।
তখন শাহবাগ থানায় আমাদের ছাত্রলীগের কর্মীরা কেউ গায়ের জ্যাকেট খুলে দিল, কেউ বাসা থেকে আমাদের জন্য গরম কাপড় এনে দিয়েছিল। তখন থানার একজন পুলিশ পকেট থেকে ৫০০ টাকা দিয়ে আমাদের জন্য নাস্তা আনালেন। এরপরে আমাদের রক্তাক্ত শরীরের অবস্থা দেখে শাহবাগ থানা থেকে সরিয়ে রমনা থানায় নিয়ে গেল। তখন রমনা থানার পুরো এলাকা চলাচলের জন্য অফ করে দেয়া হলো । এরপরেও আমাদের আওয়ামী লীগের কয়েকজন সেখানে গেল। বিএমএ থেকে ডাক্তার গেল। তারা আমাদের ক্ষত-বিক্ষত স্থানে মলম দিল। আমরা সারাদিন সেখানে ছিলাম। তারপর সন্ধ্যার সময় কোনো মামলা খুঁজে না পেয়ে ডিটেনশন দিয়ে আমাদের জেলে পাঠিয়ে দিল। নির্যাতনের মধ্য দিয়ে একটা বছর আমাদের জেল খানায় কেটে গেল। নরমাল জেল আর ডিটেনশনের জেল আলাদা। জেলের মধ্যে জেল হলো ডিটেনশন। দেখা-সাক্ষাত করা যাবে না , লোকজন আসতে পারবে না। এভাবে একবছর অন্ধকারে আমাদের কেটে গেল।
তারপর জেল থেকে বের হয়ে নেত্রী শেখ হাসিনার সাথে দেখা করলাম। তিনি আমাদের সান্ত্বনা দিলেন। নেত্রী বললেন, তাকে আল্লাহ সুস্থ রাখলে আমাদের অবশ্যই রাজনীতি করার সুযোগ দিবেন। তারপর তো নেত্রী আমাকে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বানালেন। আমাদের বিভাগ যখন ভাগ করা হলো, তখন আমাকে রাজশাহী বিভাগের দায়িত্ব দেয়া হলো। এরপর রাজশাহী বিভাগে গিয়ে কমিটি করলাম, কর্মী সভা করলাম। স্বেচ্ছাসেবক লীগের সেখানে একটা শক্ত ঘাঁটি তৈরি করলাম। এর বাহিরে বিভিন্ন এলাকা গিয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগের জন্য কাজ করেছি।
লেখক: খায়রুল হাসান জুয়েল, সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ।
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। সময় সংবাদের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতে পারে। লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় সময় সংবাদ নেবে না।

আরও পড়ুন

স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন: নেতৃত্বে আসছেন কারা?

আরও সংবাদ

বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
ভাইরাল
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
Latest News
আপনিও লিখুন
ছবি ভিডিও টিভি
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop